(Problems & Solutions of Bangladesh Railway)
পৃথিবীর সকল দেশে রেলপথ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম বলে বিবেচিত এবং এটি অত্যন্ত লাভজনকও বটে। কিন্তু আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। রেল নিয়ে সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব, মান্ধাতার আমলের ইঞ্জিন ও কোচ এবং রেলের সাথে সংশ্লিষ্ট একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর সীমাহীন লুটপাট বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রেলওয়ে থেকে লাভ দূরে থাক প্রতিবছর অনেক ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে।
সারণি-৭.৪: বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ড
| সাল | যাত্রী পরিবহণ কিমি হিসাবে (মিলিয়ন) | পণ্য পরিবহণ টন কিমি হিসাবে (মিলিয়ন) | রাজস্ব আয় (কোটি টাকায়) | রাজস্ব ব্যয় (কোটি টাকায়) |
| ২০১২-২০১৩ | ৮২৫৩.০০ | ৫২৫.০০ | ৮০৪.২৬ | ১৫৬২.৩৮ |
| ২০১৩-২০১৪ | ৮১৩৫.০০ | ৬৭৭.৩৫ | ৮০০.১৭ | ১৬০১.৬৯ |
| ২০১৪-২০১৫ | ৮৭১১.৩৬ | ৬৯৩.৮৪ | ৯৩৫.৪৫ | ১৮০৮.২৯ |
| ২০১৫-২০১৬ | ৯১৬৭.৮ | ৬৭৫.০৯ | ৯০৪.০২ | ২২২৯.২২ |
| ২০১৬-২০১৭ | ১০০৪০.৬৬ | ১০৫২.৬৭ | ৯৩০.৩৭ | ২২২৯.২২ |
| ২০১৭-২০১৮* | ১২৯৯৩.৯১ | ১২৩৬.৫০ | ১৪৮৬.১০ | ২৯১৮.০২ |
সূত্র: রেলপথ মন্ত্রণালয়। উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৯।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান সমস্যা: বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান সমস্যা সমূহ নিম্নরূপ:
ক. সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব: এটি রেলখাতে বিদ্যমান প্রধানতম সমস্যা। রেলের সাথে সংশ্লিষ্টদের সুষ্ঠু ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অভাবে এদেশের রেলব্যবস্থা সেই মান্ধাতার আমলে রয়ে গেছে।
খ. ব্যবস্থাপনার অভাব: রেলওয়ের অন্যতম সমস্যা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব। বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত অদক্ষ। অপেশাদার বা আধাপেশাদার কর্মীদের দ্বারা রেলওয়ে পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়েতে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করা এসব কর্মীদের সাধ্যের বাইরে। এই সমস্যা দিন দিন অধিক প্রকট হচ্ছে।
গ.. মান্ধাতা আমলের রেল ট্র্যাক: বাংলাদেশের অধিকাংশ রেল ট্র্যাক বৃটিশ আমলে স্থাপিত। এরপর থেকে সেই সমস্ত ট্র্যাকগুলো খুব বেশি সংস্কার করা হয়নি। ৪০ বছরের মধ্যে রেল ট্র্যাক তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেললেও বাংলাদেশে ৭০-৮০ বছরের পুরাতন রেল ট্র্যাক দিয়ে কাজ চলছে। এই সমস্ত রেলপথে দ্রুত গতিতে রেলগাড়ি চালানো সম্ভব হয় না।
ঘ. স্লিপার ও পাথরের অভাব: রেলের গতি ঠিক রাখা, দুর্ঘটনা এড়ানো এবং রেললাইনকে অধিক মজবুত করার জন্য লাইনের নিচে পর্যাপ্ত স্লিপার ও পাথর বসাতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এদেশের অনেক জায়গায় রেল লাইনের নিচে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্লিপার নেই। এমনকি কোথাও কোথাও পাথরও নেই। যথেষ্ট পরিমাণ স্লিপার ও পাথরের অভাবে রেল দুর্ঘটনার আশংকা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঙ. ইঞ্জিন ও বগির অভাব: সারাদেশে রেল ব্যবস্থা নিয়মিত রাখতে গেলে যে পরিমাণ প্রয়োজন, সেই পরিমাণ ইঞ্জিন ও বগি নেই। ফলে একই ইঞ্জিন ও বগি একাধিক রুটে ব্যবহৃত হয়। এতে একদিকে যেমন ইঞ্জিনের উপর চাপ পড়ে অপরদিকে বিভিন্ন রুটে সময়সূচি মেনে চলা সম্ভব হয় না।
চ. ত্রুটিপূর্ণ সংকেত পদ্ধতি: বাংলাদেশ রেলওয়ের সংকেত পদ্ধতি যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। অনেকক্ষেত্রে এই পদ্ধতি মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, স্বয়ংক্রিয় নয়। অবৈজ্ঞানিক ও অনাধুনিক এই সংকেত পদ্ধতির কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।
ছ. সুযোগ-সুবিধার অভাব: বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রেলযাত্রীদের তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা থাকে না। রেল গাড়ির অভ্যন্তরে ভাঙ্গা ও নোংরা সিট, নোংরা বাথরুম, ভাঙ্গা লাইট, অচল ফ্যান, স্টেশনে বিশ্রামাগারের অভাব ও দুর্গন্ধযুক্ত বাথরুম, যাত্রীদের যাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে। দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য ট্রেনে খাবারেরও তেমন কোনো ব্যবস্থা থাকে না।
জ. ডাকাতি ও চুরি: পর্যাপ্ত রেলপুলিশ ও নজরদারির অভাব এবং কর্তব্যে অবহেলার কারণে রেলগাড়ি, রেললাইন এবং রেল ওয়ার্কসপ থেকে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, তেল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্লিপার ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরি রেলওয়ের একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার l
ঝ. বিনা টিকিটে ভ্রমণ: আমাদের একটি অত্যন্ত বাজে অভ্যাস হচ্ছে আমরা ট্রেনে ভ্রমণের সময় টিকিট কাটতে চাই না অথবা এক স্টেশনের টিকিট কেটে পরবর্তী কোনো স্টেশনে নামি। দিন দিন মানুষের এই অনৈতিক অভ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় অনেকেই এটাকে অপরাধ বলে গণ্য করে না। মানুষের এই নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে রেলের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ কাঙ্খিত মানে পৌঁছাচ্ছে না।
ঞ. আর্থিক সমস্যা: বাংলাদেশ একটি উন্নয়শীল দেশ। রেলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার কথা তা দেওয়া সম্ভব হয় না। অর্থের অভাবে নতুন রেলপথ নির্মাণ, নতুন ইঞ্জিন ও বগি ক্রয়সহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ট. রেলযাত্রী ও জনসাধারণের উদাসীনতা: রেলওয়ের অব্যবস্থা, চুরি, দুর্নীতি প্রভৃতি অব্যাহত থাকলেও রেলযাত্রী বা জনসাধারণ এ সম্পর্কে উদাসীন থাকে। প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না। ফলে রেলের প্রশাসকরা রেলের উন্নয়নের ব্যাপারে উদাসীন থাকে।উপরে উল্লিখিত সমস্যা ছাড়াও রেলওয়েতে অন্য অনেক সমস্যা আছে। এ সকল সমস্যাগুলো হ্রাস করতে পারলে রেলওয়ে লাভজনক খাতে পরিণত হবে।
রেলপথে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উপায়: বাংলাদেশের রেলপথে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধানে নিম্নের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে-
ক. সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন; যেকোনো কাজ সফলভাবে করার পূর্বে প্রয়োজন একটি যথাযথ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রেলের লাইন সংস্কার নতুন ইঞ্জিন ও বগি ক্রয়সহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।
খ. দক্ষকর্মী নিয়োগ: রেল পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে হবে অথবা নিয়োজিত কর্মীদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে তুলতে হবে। এর ফলে রেলের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উত্তম হবে।
গ. প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ: রেলের নতুন ইঞ্জিন ও বগি ক্রয়, লাইন সংস্কার, স্টেশন মেরামত, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি ক্রয় প্রভৃতি কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। তবে লক্ষ রাখতে হবে অর্থ যেন অপব্যবহার না হয়ে সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
ঘ. ডাকাতি ও চুরি রোধ: রেলে ডাকাতি ও চুরি হলে রেলের নিজস্ব আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীর সংখ্যাও হ্রাস পায়। এজন্য ট্রেনে চুরি ও ডাকাতি রোধে প্রয়োজনীয় রেলপুলিশ নিয়োগ এবং অপরাধীদের সাজার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঙ. বিনা টিকিটে ভ্রমণ রোধ: যাত্রীদের টিকিট কাটা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ রেলের আয়ের উৎস। আর সেই যাত্রীরা যদি টিকিট না কেটে রেল ভ্রমণ করে তবে রেলের আয় বৃদ্ধি পাবে না। রেল ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই আমাদের সবাইকে সঠিক মূল্যের টিকিট কেটে রেলে ভ্রমণ করতে হবে।
চ. যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ: রেলের যন্ত্রপাতি যেন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সে ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদান করতে হবে। এই কাজে দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে হবে। তাহলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
ছ. আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ: রেলে আধুনিক ব্যবস্থা, লাইট, ফ্যান, সিগন্যাল বাতি, এসি প্রভৃতি যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। এর ফলে মানুষ রেলে ভ্রমণে আরাম পাবে এবং রেলের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে। আর যাত্রী বেশি হলে আয় বেশি হবে।
উপরের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার ক্ষতির মাত্রা কাটিয়ে উঠে লাভের মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।
পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more