hsc

পাঠ-৮: বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা ও সমাধান

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

19

(Problems and Solutions of Bangladesh Road Transport System)

সুপ্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সড়কপথ পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রথম অবস্থায় গরু, ঘোড়া, মহিষ বাহন হিসেবে সড়কপথে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে চাকার গাড়ি (গরু, ঘোড়া, উট চালিত) আবিষ্কৃত হওয়ায় সড়কপথ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বর্তমানে মোটর চালিত গাড়ি ও ট্রাক সড়কপথের প্রধান যানবাহন। বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্প উন্নয়নে তথা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সড়ক পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আশানুরূপ উন্নতি লাভ করতে পারেনি। নিম্নে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা বা অনগ্রসরতার কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো।

১. নদ-নদীর অবস্থান: নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা, হাওড়-বাঁওড় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এগুলোর উপর দিয়ে রাস্তাঘাট নির্মাণ করা কঠিন কাজ এবং ব্যয়বহুল। ব। তাইন তাই নদ-নদীর অবস্থান সড়ক পরিবহনের অন্তরায়।
২. নিচু ভূমিঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা নিচু হওয়ায় বর্ষার সময় পানিতে তলিয়ে যায়। এসব নিচু জমিতে উঁচু বাঁধ দেওয়া বা রাস্তা নির্মাণ করা আমাদের উন্নয়নশীল দেশের জন্য ব্যয়সাপেক্ষ।
৩. মৃত্তিকার বিশেষত্ব: বাংলাদেশের মাটি বেলে ও দোআঁশ তথা নরম প্রকৃতির। মাটি নরম প্রকৃতির হওয়ায় প্রতি বছর বন্যার সময় এদেশের সড়ক পথের প্রচুর ক্ষতি হয়। তাছাড়া নরম মাটির কারণে প্রতি বছর পুল বা কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং মৃত্তিকার বিশেষত্ব বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অন্তরায়।
৪. জলবায়ুর প্রভাব: বাংলাদেশে মৌসুমি জলবায়ু বিরাজমান। গ্রীষ্মকালে প্রচুর তাপমাত্রা বিরাজ করে। এ উচ্চ তাপমাত্রার জন্য এদেশের সড়কপথের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে পাকা সড়কের অধিকাংশই ইট ও পিচ দ্বারা নির্মিত। ফলে অধিক গরমের সময় পিচ গলে যায় এবং ঐ রাস্তার উপর দিয়ে পণ্য পরিবাহিত গাড়ি চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
৫. মূলধনের অভাবঃ প্রতিবছর রাস্তাঘাট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোটি কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এ টাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। ফলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ব্যাহত হয়।

৬. বৈদেশিক সাহায্যের অনিশ্চয়তা ও স্বল্পতা: বাংলাদেশের সড়কপথ নির্মাণের জন্য যে অর্থ ব্যয় হয় তার অধিকাংশই আসে দাতা দেশ থেকে। তবে এতে অনেক শর্ত থাকে। শর্ত পূরণ করা না হলে সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সড়ক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি হয় যা সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অন্তরায়।

৭. নির্মাণসামগ্রীর অভাব: পাকা সড়ক নির্মাণের জন্য কঠিন পাথর, ইট, সিমেন্ট, পিচ, রড ইত্যাদি প্রয়োজন। এগুলো ব্যয়বহুল হওয়ায় এবং নির্মাণ কাজের প্রয়োজনীয় কার্পেটার রোলার, মিলিং মেশিন ইত্যাদির অভাব থাকায় সড়ক পথের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। এতে করে পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা হয়।

৮. যানবাহনের অভাব: বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনের অনগ্রসরতার আরেকটি কারণ হলো পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব। বাস, ট্রাক, কার প্রভৃতি যানবাহনের অভাবে পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়।

৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যা সংঘটিত হয়, যা সড়কপথ ও সেতুর বেশ ক্ষতিসাধন করে। ফলে প্রতিবছরই সড়কপথ মেরামতের প্রয়োজন হয়। এর ফলে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

১০. সড়ক দুর্ঘটনা: বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেশি। অদক্ষ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যান্ত্রিক ত্রুটি, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা, রাস্তার কাঠামোগত সমস্যা, ফুটপাত দখল, যানজটে সময় নষ্ট হওয়া প্রভৃতি অবস্থা এদেশে পরিলক্ষিত হয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা।

১১. দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী: দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা- কর্মচারীরা টাকার বিনিময়ে পুরনো গাড়ি রাস্তায় চলার অনুমতি দেয় যা মারাত্মক বায়ুদূষণ ঘটায় এবং দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মূল্যবান জীবন ধ্বংস হয়। আবার আটককৃত গাড়ি টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

১২. শ্রমিক-মালিক সমিতির প্রভাব: বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকরা প্রায়ই তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করে। এতে যাত্রীদের যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে সমস্যা দেখা দেয়।

১৩. চাঁদা আদায়: বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য পরিলক্ষিত হয়। ট্রাফিক পুলিশ ও বড় বড় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় টোকেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজরা সড়ক পথে বাস, ট্রাক থামিয়ে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে। এতে সড়ক পরিবহন মালিকরা ভোগান্তির শিকার হয় এবং যথাসময়ে পণ্য গন্তব্যস্থলে পৌঁছে না, যা সড়ক পরিবহনে একটি বিশেষ সমস্যা।

১৪. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সড়ক পথে যান চলাচলে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে প্রায়ই রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘট, প্রতিবাদ মিছিল ও ঘেরাও প্রভৃতি পরিলক্ষিত হয়। এতে সড়কপথ বন্ধ থাকে। ফলে যাত্রীদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

১৫. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক: দেশের অধিকাংশ সড়কে থানা-খন্দক বিদ্যমান। নির্মাণে ত্রুটি ও অপর্যাপ্ত উপকরণ ব্যবহারে অল্প সময়েই রাস্তায় গর্ত সৃষ্টি হয়। মূলতঃ টেন্ডারবাজী ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের অধিকাংশই রাস্তায় ব্যয় না করে আত্মসাৎ করা হয়। এ ধরনের সড়কে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হওয়া ছাড়াও দুর্ঘটনা হয় বেশি।

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনের সমস্যাগুলো দূর করার উপায়

নিচে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা সমাধানের উপায় আলোচনা করা হলো:

১. ব্রিজ বা সাঁকো নির্মাণ: নদীমাতৃক বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে জলপথ বিস্তৃত। তাই সড়কপথ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে নি। সুতরাং জলপথের উপর ব্রিজ বা সাঁকো নির্মাণ করা গেলে গ্রামের সাথে গ্রামের এবং গ্রামের সাথে শহরের সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা স্থাপিত হবে।
২. বনায়ন সৃষ্টি: বর্ষাকালে পানির প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক সড়ক নষ্ট হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এজন্য সড়কের দুই পাশে বনায়ন সৃষ্টি করে মাটির ক্ষয়রোধ করার মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা দূর করা যেতে পারে।
৩. প্রশস্ত রাস্তা তৈরি: বাংলাদেশের বেশিরভাগ সড়ক সরু বলে পর্যাপ্ত মালামাল পরিবহনে ও যাত্রীদের যাতায়াতে কষ্ট হয়। এজন্য সড়কগুলো যথেষ্ট প্রশস্ত করতে হবে যাতে গাড়ি ও লোকজন অবাধে যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যাপ্ত মালামাল পরিবহন করতে পারে।
৪. রাস্তা নির্মাণের সময়কাল: বাংলাদেশের বেশিরভাগ রাস্তার নির্মাণ কাজ দেখা যায় বর্ষার পূর্বে স্বল্প সময় হাতে নিয়ে শুরু হয়। ফলে বর্ষার আগমনে রাস্তা আবার ভেঙ্গে যায়। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার এটি একটি বড় সমস্যা। সুতরাং রাস্তা নির্মাণ করতে হবে শুষ্ক মৌসুমে যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে যাতে সঠিকভাবে আধুনিক প্রযুক্তিতে রাস্তা নির্মাণ করা যায়।
৫. আইন প্রয়োগ: আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরো কঠোর হতে হবে যাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ পুরানো গাড়ি রাস্তায় চলতে না পারে। তাছাড়া অদক্ষ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন কোনো লোক গাড়ি চালালে কিংবা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. মূলধন যোগানো: সড়কপথ নির্মাণে পর্যাপ্ত পরিমাণে মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা যথাযথভাবে ব্যয়িত হয় কী-না সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে সড়ক নির্মাণে বিদেশী সাহায্য গ্রহণ করা যেতে পারে।
৭. ঋণ গ্রহণ: মজবুত, স্থায়ী এবং প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করার জন্য ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে যাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুততার সাথে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
৮. উপকরণ সরবরাহ; প্রশস্ত ও মজবুত সড়ক নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ইট, পাথর, সিমেন্ট, বালি, পিচ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদির সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে।
৯. উন্নতমানের যানবাহন আমদানি: বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন সমস্যা সমাধান করতে হলে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির পরিবর্তে নতুন গাড়ি আমদানি করতে হবে।
১০. সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি বন্ধ: দক্ষ কোম্পানীকে দিয়ে নিবিড় দুর্নীতিমুক্ত তত্ত্বাবধানে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার প্রয়োজন, যাতে নির্মিত সড়কে খানা-খন্দ্বক তৈরি না হয় ও সড়ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উল্লেখিত উপায়সমূহের সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। পরিবহন ব্যবস্থাই একটি দেশকে অন্যান্য দেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...