(Biome)
জীবের সাথে জীবের, জীবের সাথে জড় এবং পরিবেশের বিভিন্ন দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান উপাদানের মধ্যে সবসময় আন্তঃক্রিয়া পরিচালিত হয়। এ আন্তঃক্রিয়ার ফলে যে উদ্ভিদ বা প্রাণী সে স্থানের জন্য উপযুক্ত সেই উদ্ভিদ বা প্রাণী সেখানেই জন্মাবে। জীবের সাথে জড় মাধ্যম ও পরিবেশের এই আন্তঃক্রিয়া বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম নামে পরিচিত। ইকোসিস্টেমকে যখন বিশ্বমাত্রায় (সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে) প্রকাশ করা হয় তখন একে বায়োম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি বায়োমের সাধারণ প্রকৃতি ও বিস্তৃতি নির্ভর করে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, মাটির বৈশিষ্ট্য, পরিবেশীয় বাধা (যেমন-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, বড় হ্রদ, মরুভূমি প্রভৃতি) ইত্যাদির ওপর। প্রধানত ভূমিরূপ, জলবায়ু ও প্রধান উদ্ভিজ্জ মিলিতভাবে এক একটি বায়োম সুনির্দিষ্ট করে থাকে। অতএব বলা যায় যে, নির্দিষ্ট পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবে বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জীবমণ্ডলের বৃহৎ ভৌগোলিক একককেই বায়োম বলে। বায়োম জীবমণ্ডলের সর্ববৃহৎ একক। পরিবেশের সাথে কোনো এলাকায় বিদ্যমান জীবসম্প্রদায়ের আন্তঃক্রিয়ার ফলে বায়োম প্রতিষ্ঠা লাভকরে। বায়োমকে তাই বলা যেতে পারে একটি বায়োটিক কমিউনিটি (biotic community), যাতে উদ্ভিদ ও প্রাণী সাড়াদানকারী (active) একক হিসেবে কাজ করে।
স্থলজ বায়োম (Land Biome)
যেসব বায়োম স্থলভাগে অবস্থিত এবং প্রচুর উদ্ভিজ্জ সমৃদ্ধ তাকে স্থলজ বায়োম বলে। জলবায়ু, উদ্ভিজ্জ এবং অবস্থানের ভিত্তিতে স্থলজ বায়োম নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত করা যায়। যেমন-
তুন্দ্রা বায়োম (Tundra biome)
পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উত্তরের, বৃক্ষহীন এবং শীতলতম স্থান নিয়ে গঠিত বায়োমকে তুন্দ্রা বায়োম বলে। সাইবেরিয়ার উত্তরাংশ, গ্রিনল্যান্ড, আলাস্কা ও উত্তর মেরু অঞ্চল নিয়ে এ বায়োম গঠিত।
পরিবেশ: চরম শীত ও ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে বছরের দীর্ঘ সময় বরফে ঢাকা থাকে। ৬-৮ সপ্তাহ গ্রীষ্মকাল এবং তখন উপরের কিছু বরফ গলে ছোট ছোট জলাভূমির সৃষ্টি হয়। বাৎসরিক বৃষ্টিপাত ১৫ সে.মি. যা বরফ হিসেবে পড়ে। উদ্ভিদের জীবন অতি সংক্ষিপ্ত। জীবের মৃতদেহ এখানে পুষ্টির প্রধান উৎস (নাইট্রোজেন ও ফসফরাস)। তুন্দ্রা বায়োম ২টি অংশে বিভক্ত যেমন- উত্তর মেরু (arctic) তুন্দ্রা এবং আলপাইন (alpine) তুন্দ্রা।
উদ্ভিদ: জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত কম। এই অঞ্চলের প্রধান উদ্ভিদ মস এবং লাইকেন। এছাড়া রয়েছে কয়েক প্রকার ছোট গুল্ম এবং বৃক্ষ।

প্রাণী: এখানে প্রাণী খুব কম। বেশি ঠান্ডার জন্য উভচর, সরীসৃপ ও মাছ নাই অথবা খুব কম। এখানে প্রধানত উষ্ণ রক্তের স্তন্যপায়ী এবং গ্রীষ্মকালে কিছু যাযাবর পাখি দেখা যায়। স্তন্যপায়ীর মধ্যে বলগা হরিণ, খরগোশ, খেকশিয়াল, ভাল্লুক, কার্বো প্রধান। পাখিদের মধ্যে পেঙ্গুইন, লুনা, হাঁস, বাজপাখি, জিগার, স্যান্ড পাইপার, পেঁচা প্রধান। গ্রীষ্মকালে কিছু মশা ও মাছির আগমন ঘটে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে শামুক, জোঁক, জলজ বিটল ও মিজ লার্ভা উল্লেখযোগ্য।
প্রাণিদেহ (শ্বেতভল্লুক) লম্বা ও ঘন লোমে আবৃত। চামড়ার নিচে ৬" পুরু চর্বির স্তর থাকে এবং প্রায় সব প্রাণীর রক্ত সাদা।
তৃণভূমির বায়োম (Grassland biome)
পৃথিবীর যে অঞ্চলে প্রধানত ঘাস জন্মে কিন্তু বড় গুল্ম বা বৃক্ষ জন্মে না তেমন এলাকা নিয়ে তৃণভূমির বায়োম গঠিত।
মহাদেশীয় ভূখন্ডের পূর্বাংশে তৃণভূমির বায়োম দেখা যায়। যেমন- আমেরিকার প্রেইরি, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং রাশিয়ার দক্ষিণাংশ।
পরিবেশ: এখানে বার্ষিক ২৫-৭৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়। সে কারণে বৃক্ষের সমরোহ নেই, আবার মরুভূমিও নেই। মাটি হিউমাসসমৃদ্ধ, দিনে ও রাতে তাপমাত্রা কম-বেশি হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। শীতে তাপমাত্রা ১৫° সে. এ নেমে যায় আর গ্রীষ্মকালে ৩২০ সে. এর উপরে ওঠে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী তৃণভূমির বায়োমকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সাভানা (tropical savannas) এবং শীতপ্রধান তৃণভূমি (temperate grassland) নামক ২টি অঞ্চলে বিভক্ত করেন।
উদ্ভিদ: ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ এ অঞ্চলের প্রধান উদ্ভিদ। বড় ঘাস ১২ থেকে ১৫ সে.মি. লম্বা হয়। এরা গুচ্ছাকারে জন্মায়। যব, গম, রাই, ভালো জন্মে। বৃক্ষ ও গুল্ম অনুপস্থিত। মধ্যপ্রাচ্য ও সাহারায় অতিমাত্রায় পশু চারণের ফলে বর্তমানে ভূমি তৃণশূন্য।
প্রাণী: তৃণভূমি বায়োমে উৎপাদক ঘাসের আধিক্যে বহু সংখ্যক প্রাণী অভিযোজিত হয়। প্রধান তৃণভোজী, প্রাণী হলো বাইসন, এন্টিলোপ, জেব্রা, জিরাফ, হরিণ, ঘোড়া, ক্যাঙ্গারু ইত্যাদি। এদের ভক্ষক হলো সিংহ, হায়েনা ও খেকশিয়াল। অধিকাংশ প্রাণী দলবদ্ধ হয়ে বাস করে। কীটপতঙ্গের মধ্যে উঁইপোকা, পঙ্গপাল, ঘাসফড়িং, মৌমাছি, মাছি, প্রজাপতি ও এদের খাদক হিসেবে পাখি, সাপ, টিকটিকি, ব্যাঙ বাস করে।
বনভূমির বায়োম (Forest biome)
পৃথিবীপৃষ্ঠের এক তৃতীয়াংশ বনভূমি দ্বারা আবৃত। বৃষ্টিবহুল এলাকা হওয়ায় এখানে প্রধান জীবগোষ্ঠী হলো বৃক্ষ এবং অন্যান্য কাষ্ঠল উদ্ভিদ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বনভূমি দেখা যায়। নিচে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি বনাঞ্চল বায়োম তুলে ধরা হলো।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি বনাঞ্চল: আমাজান নদীর অববাহিকায় সবচেয়ে বড় এবং ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ২য় বৃহত্তম বনভূমি দুটি অবস্থিত। এছাড়া আফ্রিকা, ভারত, বার্মা, মধ্য আমেরিকা ও ফিলিপাইনে এ জাতীয় বনাঞ্চল রয়েছে।
পরিবেশ: এখানকার তাপমাত্রা গড়ে সে.। এখানকার বাৎসরিক বৃষ্টিপাত ২৫০-৪৫০ সে.মি. যা সারা বছরই হয় তবে বর্ষাকালে অপেক্ষাকৃত বেশি। সে কারণে মাটি ভেজা ও স্যাঁতসেতে থাকে। চিরসবুজ বড় বড় বৃক্ষ থাকায় বনের তলদেশ অন্ধকার ও ঠাণ্ডা। মাটি অম্লীয় ও তাতে পুষ্টি কম।
উদ্ভিদ: বিভিন্ন ধরনের উচ্চ বৃক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ এখানে জন্মে এবং একক কোনো প্রজাতি আধিপত্য বিস্তার করে না। এমন বনে সাধারণত প্রজাতিবৈচিত্র্য বেশি। অধিকাংশই চিরসবুজ তবে বিচ্ছিন্ন কিছু পর্ণমোচী বৃক্ষ জন্মে। বৃক্ষগুলো ২-৩ স্তরে চাঁদোয়া (Canopy) গঠন করে। বৃক্ষের সাথে অনেক কাষ্ঠল লতা এবং পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ জন্মে। এছাড়া, ফার্ন, মস ও তাল জাতীয় গাছ জন্মে।
প্রাণী: এই বন প্রাণিবৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। বানর, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, শামুক, জোঁক, বিছা, মথ, পিঁপড়া, উঁইপোকাসহ নানা প্রকার পতঙ্গ উল্লেখযোগ্য।
জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more