(Importance of Studying Physical Geography)
পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়েছে। প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণেই রচিত হয়েছে মানবসভ্যতার ভিত্তি। এসব প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে জানতে এবং তার ব্যবহার উপযোগিতা নির্ণয়ে প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব রয়েছে। যেমন-
ক. পৃথিবীর জন্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর জন্ম। কীভাবে পৃথিবী সৃষ্টি হলো, কী প্রকারে বাষ্পীয় ও তরল অবস্থার মধ্যে দিয়ে পৃথিবী বর্তমান অবস্থায় পৌছেছে অর্থাৎ পৃথিবীর জলভাগ, স্থলভাগ ও বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তি, তা আমরা প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জানতে পারি। এছাড়াও ভূপৃষ্ঠের আজ যেখানে পাহাড়-পর্বত, কয়েক হাজার বছর বিবর্তনের ফলে সেসব স্থানে সমুদ্র অথবা সমভূমির সৃষ্টি হতে পারে; সাগর পরিবর্তন হয়ে সমভূমি বা পাহাড় পর্বতের সৃষ্টি হতে পারে; অথবা সমভূমি পরিবর্তিত হয়ে পাহাড় বা সমুদ্রে রূপান্তরিত হতে পারে; এবং ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাতের ফলে কোনো কোনো স্থান উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এসবই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জানা যায়।। এছাড়াও প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কে জ্ঞানার্জন অতি গুরুত্বপূর্ণ।
উনবিংশ শতাব্দীর ভৌগোলিক চিন্তা বিশ্লেষণ করে ভূগোলবিদগণ দেখেছেন প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব এ সময়ে বেশি ছিল। আর এ সময়েই প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু ভূমিরূপবিদ্যাকে ভূগোলবিদগণ গুরুত্বের সাথে গবেষণা শুরু করেন। ভূগোলে বৈজ্ঞানিক নিমিত্তবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ধারক জার্মান ভূগোলবিদ ফ্রেডরিখ র্যাটজেল (Friedrich Ratzel) এবং আমেরিকান ভূগোলবিদ এলেন চার্চিল সেম্পলও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক ভূগোলের ভূমিকার ওপর অধিক গুরুত্ব দেন। পরবর্তীতে আচরণবাদ মানুষের কার্যক্ষমতাকে প্রাধান্য দিলেও তা সীমিত এবং প্রকৃতিকে আশ্রয় করেই প্রকাশ পায়। তাই মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক বিশ্লেষণে প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্ব অপরিসীম।
খ. ভূমিরূপ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: প্রাকৃতিক ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভূমিরূপবিদ্যা। এ বিষয়ের প্রধান বিষয়বস্তু হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা, শিলা ও খনিজের উৎপত্তি, ভূআলোড়ন ও তার ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ; সূর্য হতে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর প্রাকৃতিক কোন কোন শক্তি দ্বারা কীভাবে পৃথিবীর পদার্থসমূহ নিজেদের ঘনত্ব অনুসারে তার কেন্দ্র হতে ভূত্বক পর্যন্ত স্তরে স্তরে সজ্জিত হলো; আবার ভূঅভ্যন্তর এবং তার উপরিভাগের কি কি প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের দ্বারা ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন জলভাগ ও স্থলভাগের সৃষ্টি হলো; এবং বর্তমানে এসব প্রাকৃতিক শক্তি কী প্রকারে ভূপৃষ্ঠের সর্বদা পরিবর্তন করে যাচ্ছে, কীভাবে পাহাড় থেকে নদীগুলো উৎপত্তি হয়ে সমুদ্রে পড়েছে। প্রাকৃতিক ভূগোলের এ শাখা ভূত্বক ও ভূ-অভ্যন্তরস্থ শক্তি ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারে মানবসভ্যতাকে নির্দেশনা দেয়। তাই ভূমিরূপবিদ্যা পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।
গ. বারিতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: বারিতত্ত্বে সাধারণভাবে পৃথিবীর পানির উৎস ও বণ্টন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। এটি প্রাকৃতিক ভূগোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই বিষয়টি পাঠ করলে আমরা জানতে পারি পৃথিবীতে কতগুলো সাগর, মহাসাগর আছে এবং এগুলোর গভীরতা, আয়তন ইত্যাদি। পৃথিবীর সমগ্র পানিরাশি কীভাবে রূপান্তরের মাধ্যমে স্থানান্তর হয় এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার স্বস্থানে ফিরে আসে তা বারিতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায়। যেহেতু পানি মানবজাতির জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান এবং সম্পদ হিসেবে সভ্যতা বিনির্মাণে প্রভাব বিস্তারকারী; আর বারিতত্ত্ব এসব নিয়ে আলোচনা করে তাই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের গুরুত্বও অপরিসীম।
ঘ. সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৃথিবী গ্যাসীয় অবস্থা হতে কঠিন অবস্থায় উপনীত হওয়ার সময় ভূপৃষ্ঠ অসমানভাবে সংকুচিত হয়েছিল। এর ফলে পাহাড়-পর্বত ও বারিমণ্ডলের সৃষ্টি হয়েছে।
পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য চাই আরও খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের। পৃথিবীর স্থলভাগের সামান্য এলাকা (মোট আয়তনের এক চতুর্থাংশেরও কম) বর্তমানের জনসংখ্যার বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। স্থলভাগের বহু অঞ্চলের অনবায়নযোগ্য অনেক জ্বালানি ও শক্তি সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া মানুষের আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে পূর্বের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণ জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের। তাই বাধ্য হয়েই মানুষকে হাত বাড়াতে হচ্ছে সমুদ্র সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণের দিকে। প্রাকৃতিক ভূগোলের সমুদ্রবিজ্ঞানে সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও অনুসন্ধান বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এসব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
৬. জলবায়ুতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: জলবায়ুতত্ত্ব পাঠে আমরা প্রথমে বায়ুমণ্ডলের গভীরতা, বায়ুর স্তরবিন্যাস, বায়ুর উপাদান, বায়ুর তাপ ও চাপ প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারি। আবার বায়ুপ্রবাহের কারণ, দিক, বায়ুর শ্রেণিবিভাগ ইত্যাদি বিষয়ও জলবায়ুতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায়। এমনকি বায়ুর আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাতের কারণ, বৃষ্টিপাতের প্রকারভেদ প্রভৃতি বিষয়ও জানা যায়। এছাড়া আবহাওয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রকার জলবায়ুর বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা যায়। আর জলবায়ু সমগ্র পৃথিবীর পরিবেশ ও মানবজীবনযাত্রাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। তাই প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠে জলবায়ুতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
চ. বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ঊর্ধ্বদিকে যে বায়বীয় আবরণ সমগ্র পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তাকে বায়ুমণ্ডল বলে। বায়ুমণ্ডল ঊর্ধ্বাকাশে প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাকৃতিক ভূগোলে বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। বায়ুমণ্ডল নানাপ্রকার গ্যাসীয় উপাদান, যেমন: নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বায়ু আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু স্পর্শ দ্বারা অনুভব করতে পারি। মাধ্যাকর্ষণের ফলে বায়ুরাশি পৃথিবীর গায়ে লেগে আছে এবং পৃথিবীর সাথে আবর্তন করছে। মানুষসহ সমগ্র জীবজগৎ এবং ভৌত পরিবেশ বায়ু সমুদ্রে নিমজ্জিত। বায়ুমণ্ডলীয় বিভিন্ন অবস্থা পৃথিবীর সমগ্র জীবজগতের ওপর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। তাই এসব বিষয়কে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হলে প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রাকৃতিক ভূগোলের - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more