পাঠ-১১ ও ১২: জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(DemographTransitional Model)

জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল হলো এমন একটি মডেল, যা সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যার পরিবর্তন বর্ণনা করে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে কোনো অঞ্চল বা দেশের জন্মহার ও মৃত্যুহার পরিবর্তিত হয়। ফলে ঐ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থির থাকে। এর ফলে জনসংখ্যা এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে পরিবর্তিত হতে থাকে। জনসংখ্যার এই ধরনের ট্রানজিশনই জনমিতিক ট্রানজিশন নামে পরিচিত। জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় আধুনিক মডেল হিসেবে পরিচিত।

উৎপত্তি: বিখ্যাত আমেরিকান ভূগোলবিদ ওয়ারেন থমসন (Waren Thompson) ১৯২৯ সালে প্রথম জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এই মডেলের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে Waren Thompson শিল্পায়িত আধুনিক সমাজের গত দু'শ বছরের জন্মহার, মৃত্যুহার এবং ট্রানজিশন পর্যালোচনা করেন।

মূল বিষয়বস্তু

এ মডেল জন্মহার ও মৃত্যুহারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে ধারনা প্রদান করা হয়েছে। এ মডেল অনুসারে-প্রথমে কোনো দেশে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই বেশি থাকে। ধীরে ধীরে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার কমতে শুরু করে। এর পরে ধীরে ধীরে জন্মহারও কমতে শুরু করে। ।। জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস পায় অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকায় এই সময়ে কোনো দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলকে Thompson চারটি ধাপে আলোচনা করেন। ধাপ চারটি হলো:
১. উচ্চ জন্মহার এবং উচ্চ মৃত্যুহার।
২. অধিক জন্মহার এবং মৃত্যুহার হ্রাস।'
৩. মৃত্যুহার ও জন্মহার উভয়ই হ্রাস।
৪. মৃত্যুহারের তুলনায় কম জন্মহার।

প্রথম ধাপ

এটি হলো ট্রানজিশনের পূর্বের সময়। অনুন্নত দেশসমূহ যেখানে শিল্পায়ন হয়নি, জীবনযাত্রার নিম্নমান বিদ্যমান, কৃষি নির্ভরশীল অর্থনীতি, শিক্ষার হার কম সেই সমস্ত দেশই এই ধাপের অন্তর্গত। যেহেতু এই সকল দেশের অর্থনীতি অনুন্নত সেহেতু অধিক জন্মহার ও মৃত্যুহার থাকে।

বার্মা (মায়ানমার), ভুটান, পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা ইত্যাদি দেশসমূহ এই পর্যায়ে পড়ে।
এই পর্যায়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে অধিক জন্মহার, অধিক মৃত্যুহার, অধিক শিশু মৃত্যুহার, জীবনযাত্রার নিম্নমান, অনুন্নত অর্থনীতি, শিক্ষার অভাব, খাদ্যের অভাব, চিকিৎসার অভাব ইত্যাদি।
এই ধাপে অধিক জন্মহার থাকার মূল কারণগুলো হলো বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বড় পরিবার, শিক্ষার অভাব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কৃষিতে নির্ভরশীলতা ইত্যাদি। এছাড়া অধিক মৃত্যুহার থাকার কারণ হলো খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব, যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি।

দ্বিতীয় ধাপ

জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের এই ধাপকে শিল্পধাপ বলা যায়, যা শুরু হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে। এই ধাপে শিল্পবিপ্লব মূলত কৃষিবিপ্লবের সঙ্গে শুরু হয়। এই সময়ে এসে মৃত্যুহার হ্রাস পায়, কিন্তু জন্মহার অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে এই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের এই ধাপের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো অধিক জন্মহার ও নিম্ন মৃত্যুহার। নগরায়ণ, কৃষির উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, পানির সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাদ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি ইত্যাদি। ফলে ধীরে ধীরে মৃত্যুহার কমতে থাকে। কিন্তু জন্মহারের ক্ষেত্রে ১ম ধাপের ন্যায় অবস্থা বিরাজ করার কারণে জন্মহার অপরিবর্তিত থাকে। এর ফলে ২য় ধাপে এসে কোনো দেশে অধিক জনসংখ্যা যোগ হয়। এই ধাপকে আরো কিছু উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে।

২.১. প্রাক ট্রানজিশন: এই পর্যায়ে মৃত্যুহার কমতে শুরু করে কিন্তু মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে জন্মহার কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
২.২. মধ্য ট্রানজিশন: জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই কমতে শুরু করে, কিন্তু জন্মহার মৃত্যুহারের তুলনায় বেশিই থাকে।
২.৩. ট্রানজিশন পরবর্তী সময়: জন্মহার ও মৃত্যুহার কমার ধারা অব্যাহত থাকে, কিন্তু এই সময়েও জন্মহার মৃত্যুহারের তুলনায় অধিক থাকে।

তৃতীয় ধাপ

এই পর্যায় বা ধাপকে বলা হয় অর্থনৈতিকভাবে উন্নত পর্যায়। এই ধাপে এসে জন্মহার কমতে শুরু করে এবং মৃত্যুহারের সমান হয় এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে উন্নত দেশগুলোতে এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। ইউরোপের দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এই ধাপের অন্তর্গত।
এই সময় কতগুলো বিশেষ কারণে জন্মহার হ্রাস পেতে থাকে, যেমন: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, নির্ভরশীলতা হ্রাস, অধিক নগরায়ণ ও ছোট পরিবার, নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নতি, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং এই সব কিছুর সাথে জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি।

চতুর্থ ধাপ

জনমিতিক ট্রানজিশন মডেলের ৪র্থ পর্যায়ে জনসংখ্যার পরিবর্তন (জন্মহার, মৃত্যুহার) স্থিতিশীল থাকে। জন্মহার ধীরে ধীরে এমনভাবে কমতে শুরু করে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যতে পৌছায়। একই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ও জীবনমান উন্নত হওয়ায় মৃত্যুহারও কমতে শুরু করে। এর ফলে দেশে জনসংখ্যা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে ও নির্ভরশীল জনসংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
নিউজিল্যান্ড, সুইডেনের মতো উন্নত দেশগুলোতে এই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।

সমালোচনা: এ তত্ত্বটি অধিক যুক্তিযুক্ত ও বাস্তব বলে প্রমাণিত হলেও কতগুলো বিষয় অনিশ্চিত। এ তত্ত্বটি তাই নানাভাবে
সমালোচিত। যেমন-
১. ঐতিহাসিক ধারণার ভিত্তিতে এ মডেল দাঁড় করানো হয়েছিল। এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই।
২. পরিবর্তনমূলক মডেলে অবাধ-নীতিকে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করা হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রচেষ্টার কথা উল্লিখিত হয়নি।
৩. এ মডেলে স্থানান্তরের (অভিগমন) কথা বিবেচনা করা হয়নি।
৪. এখানে জন্মহার ও মৃত্যুহারের ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করা হয়নি। এখানে জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাসের কথা অধিক বিবেচিত হয়েছে।
৫. এ মডেলে উল্লেখ করা হয়, কেবল নগরায়িত স্তরেই জন্মহার কমতে থাকে, কিন্তু ডেনমার্ক-সুইজারল্যান্ড শিল্পায়নের আগেই নিম্ন প্রজননশীলতা অর্জনে সক্ষম হয়।

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...