বসতি (Settlement) (তৃতীয় অধ্যায়)

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

Settlement

প্রাকৃতিক পরিবেশে অর্থাৎ প্রকৃতির সাথে মানুষের অভিযোজনের প্রথম পদক্ষেপ হলো বসতি স্থাপন। প্রাচীনকালে মানুষেরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিভ্রমণ করতো। অর্থাৎ তারা যাযাবর জীবনযাপন করতো। এ সময় মানুষ গাহাড়ের গুহায়, বড় কোনো গাছের নিচে অথবা উন্মুক্ত স্থানে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতো। মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন করতে শেখে কৃষিকাজ আবিষ্কারের পর। কেবল প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে না থেকে মানুষ যুগে যুগে নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে নানাবিধ বসতি স্থাপন করতে শিখেছে। মানুষ কোন পরিবেশে কতটুকু খাপ খাইয়ে নিতে পারল ঐ পরিবেশে স্থাপিত বসতি তার প্রমাণ।

বসতি (Settlement)-মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি
পরিবেশ দূষণ
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি
অর্থনৈতিক মন্দা
বিশুদ্ধ পানির অভাবে
অর্থের অভাবে
খাদ্যের অভাবে
সুস্থ বাসস্থানের অভাবে

(Geographical Environment and Variation of Settlement)

বসতির সংজ্ঞা

বসতি বলতে শুধু ঘরবাড়িকে বোঝানো হয় না বরং ভূগোলে বসতি বা Settlement ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মানব বসতির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করা হলো-

* "স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নির্মিত আবাসস্থলকে বসতি বলা হয়।"- ব্রিটিশ ভূগোলবিদ Neil Robert Smith (Dictionary of Geography)।

*"প্রয়োজনের নিমিত্তে কোনো স্থানে এক বা একাধিক মানুষ যখন বসবাস করতে শুরু করে, তখন তাকে বসতি বলে"- ফরাসি ভূগোলবিদ Jeans Vanier।

* "Settlement is the study of forms of the cultural landscape."- আমেরিকান ভূগোলবিদ Terry G. Jordan 1

*"বসতি বলতে এক বা একাধিক আবাসস্থল, জমি, পথ-ঘাট, পার্ক বা বাগান হিসাবে ব্যবহৃত খোলা জায়গাসহ বসবাসের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার প্রপঞ্চকে (phenomena) বুঝায়।"- আমেরিকান ভূগোলবিদ অধ্যাপক জন বুকানন।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা বলা যেতে পারে যে- কোনো কোনো একটি একটি স্থানে : মানুষ একত্রিত হয়ে স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য প্রকৃতির বুকে যে অবয়ব তৈরি করে তাকে বসতি বা Settlement বলে।

ভৌগোলিক পরিবেশ ও বসতি (Geographical Environment and Settlement)

মানুষ সবসময় তার পছন্দমতো জায়গায় বসতি স্থাপন করতে পারে না। কোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সেই স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ, অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের উপাদানসমূহ অনুকূলে থাকতে হবে। এই উভয় প্রকার পরিবেশ কোনো স্থানে মানব বসতি স্থাপনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
যে সমস্ত ভৌগোলিক পরিবেশ মানব বসতি স্থাপনে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে থাকে সেগুলো নিম্নরূপ-

প্রাকৃতিক পরিবেশ: প্রাকৃতিক পরিবেশ মানব বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করে থাকে। কোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সে স্থানের ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, পানির সহজলভ্যতা প্রভৃতি বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হয়। নিচে এ বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-

ক. ভূপ্রকৃতি: বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথমে যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয় সেটি হচ্ছে ভূপ্রকৃতি। সমতল ভূমি অপেক্ষা পাহাড়ি ও বন্দুর অঞ্চলে জীবনযাত্রা যথেষ্ট কষ্টদায়ক বলে মানুষ বসতি স্থাপনে সমতল ভূমিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। যেমন: ঢাকা, ময়মনসিংহ অঞ্চল।
খ. মৃত্তিকা: উর্বর মাটিতে কৃষিকাজ ভালো হয়। ভালো ফল জন্মে। বালুকাময়, পাহাড়ি বা অনুর্বর মাটিতে ভালো ফসল জন্মে না। এজন্য অনুর্বর মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চল অপেক্ষা উর্বর মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চলে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। যেমন- নদী তীরবর্তী পলল মৃত্তিকাবিশিষ্ট অঞ্চল।
গ. জলবায়ু: যে সমস্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত সূর্যতাপ পাওয়া যায় ও পরিমিত বৃষ্টিপাত হয় সেসব জায়গা বসবাসের অনুকূল। এরূপ স্থানে কৃষির বিস্তার ঘটে। ফলে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। যেমন: মৌসুমি, নাতিশীতোষ্ণ ও ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল। পক্ষান্তরে, দূর্গম মরু বা মেরু অঞ্চল অথবা অধিক তাপ বা শৈত্যপ্রবাহবিশিষ্ট অঞ্চলে বসবাস কষ্টসাধ্য বলে কম বসতি গড়ে ওঠে।
ঘ. সূর্যালোক: যে সমস্ত অঞ্চলে প্রয়োজনের অধিক বা কম মাত্রায় সূর্যের আলো পড়ে, সে সমস্ত অঞ্চলে ভালো কৃষিকাজ করা যায় না। এ কারণে মরু বা মেরু অঞ্চল অপেক্ষা ক্রান্তীয় অঞ্চলে অধিক বসতি স্থাপিত হয়।
ঙ. পানির সহজলভ্যতা: দৈনন্দিন জীবনে পানির ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রাচীনকাল থেকেই পানির উৎসের কাছে বা পানির উৎসকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠেছে। যেমন- বিভিন্ন দেশের নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বসতি। যে সমস্ত অঞ্চলে পানির সহজলভ্যতা কম, সে সমস্ত অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত কম বসতি স্থাপিত হয়। যেমন: সাহারা মরুভূমি বা তুন্দ্রা অঞ্চল।
সামাজিক পরিবেশ: প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নতুন পরিবেশ তৈরি করে তখন তাকে সামাজিক পরিবেশ বলে। মানব বসতি নির্মাণে সামাজিক পরিবেশ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন-

ক. অর্থনীতি: যে সমস্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ বা খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় অথবা কাজের ভালো ক্ষেত্র আছে, সেখানে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, কাজের ভালো ক্ষেত্র না থাকলে অথবা অর্থ আয়ের উৎস কম থাকলে সেখানে মানুষ বসবাস করতে উৎসাহী হয় না বলে কম বসতি গড়ে ওঠে।
খ. সংস্কৃতিঃ একই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ। একত্রে বসবাস করতে চায়। এজন্য পাহাড়ি উপজাতিরা এক জায়গায়, সমতলের অধিবাসীরা অন্য জায়গায় বসতি স্থাপন করতে চায়। বিশ্বের সর্বত্রই একই সংস্কৃতির লোক এক জায়গায় বসতি স্থাপন করে থাকে।
গ. সমাজ: একই সামাজিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষ একত্রে বসবাসের জন্য পৃথক বসতি গড়ে তোলে। যেমন: শহুরে সমাজের দরিদ্র শ্রেণি নগরে বস্তি গড়ে তোলে।

ঘ. রাজনীতি: রাজনৈতিক কারণেও অনেক সময় বসতির স্থান পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন বসতি তৈরি হয়। যেমন-সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে ইসরাইল রাষ্ট্র কর্তৃক অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি নির্মাণ। আবার মায়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে (বাংলাদেশ সরকারের অনুকূলে) কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা জাতি কর্তৃক বসতি স্থাপন। তবে রাজনৈতিক কারণে বসতি স্থাপনজনিত সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা যায়। যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের আলোচনা ফলপ্রসু হলে কক্সবাজারের বসতি স্থাপনজনিত সমস্যা সমাধান করা যাবে।

উপরে উল্লিখিত কারণ ছাড়াও নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত কারণ, ব্যক্তিগত পছন্দ, সম্পদজনিত কারণ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Diversity of Human Settlement)

দেশ ও অঞ্চলভেদে মানব বসতিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়। এ কারণে বসতির শ্রেণিবিভাগ করা বেশ জটিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর কতিপয় প্রখ্যাত ভূগোলবিদ যেমন- ফ্রান্সের ভিডাল ডি লা ব্লাশ, জার্মানির ওয়াল্টার ক্রিস্টলার, ভারতের জ্যোতির্ময় সেন, বাংলাদেশের আব্দুল বাকী এবং সাবিহা সুলতানা প্রমুখ ভূগোলবিদ বসতির শ্রেণিবিভাগ করেছেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল বাকী প্রদত্ত বসতির শ্রেণিবিভাগ এখানে উল্লেখ করা হলো:-

ক. স্থিতিকাল অনুসারে: ক্ষণস্থায়ী, অস্থায়ী ও স্থায়ী বসতি।
খ. অবস্থান অনুসারে: জলাশয়, পাহাড়ি ও সমভূমি বসতি।
গ. আকৃতি অনুসারে: দণ্ড, সমকোণী, স্থূলকোণী, চৌমাথা ও বৃত্ত বসতি।
ঘ. বিন্যাস অনুসারে: সারিবদ্ধ, অনুকেন্দ্রিক, সংঘবদ্ধ, বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন বসতি।
ঙ. পেশা অনুসারে: কৃষি, কুমোর, তাঁতি ও জেলে বসতি।
চ. জনসংখ্যার আকার অনুসারে খামার, পাড়া, ক্ষুদ্র ও বড়গ্রাম।

ক. স্থিতিকাল অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: কত দিন স্থায়ী হবে, এর ওপর ভিত্তি করে বসতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. ক্ষণস্থায়ী বসতি: যে বসতি বছরের খুব অল্পসময় ব্যবহৃত হয় সেগুলোকে ক্ষণস্থায়ী বসতি বলে। এই ধরনের বসতি বর্তমান সময়ে দেখা যায় না। প্রাচীন খাদ্য সংগ্রহের যুগে এশিয়া মাইনরে, এরূপ বসতির প্রাধান্য ছিল।

২. অস্থায়ী বসতি: এক সময় মানুষ কৃষিকাজ জানত না। তখন শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করা ছিল বেঁচে থাকার প্রধানতম অবলম্বন। এ সময় মানুষ যেখানে শিকার বা খাবার পাওয়া যেত, সেখানে অস্থায়ী ভিত্তিতে বসতি নির্মাণ করত। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত খাবার শেষ হয়ে গেলে তারা নতুন কোনো স্থানে পুনরায় বসতি স্থাপন করত। এ ধরনের বসতিকে অস্থায়ী বসতি বলে। মরু অঞ্চলে বেদুঈন, মেরু অঞ্চলে এস্কিমো, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী, বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের বসতি নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

৩. স্থায়ী বসতি: অনেক বছর ধরে যে সমস্ত বসতি টিকে থাকে তাকে স্থায়ী বসতি বলে। বর্তমানে পৃথিবীর ..... অধিকাংশ বসতি স্থায়ী বসতির আওতাভুক্ত। যেমন- ঢাকা শহরের বসতি।

খ. অবস্থান অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: বসতি কোথায় অবস্থিত, তার ওপর ভিত্তি করে একে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা:-

১. জলাশয় বসতি: কোনো বড় জলাশয় (যেমন- নদী, হ্রদ, সমুদ্র প্রভৃতি) এর তীরবর্তী এলাকায় যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে জলাশয় বসতি বলে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই ধরনের বসতি গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের প্রায় সকল বৃহত্তর জেলা শহরগুলোর (যেমন- শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী নারায়ণগঞ্জ) বসতি।
২. পাহাড়ি বসতি: পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো বসতি গড়ে উঠলে তাকে পাহাড়ি বসতি বলে। এ ধরনের বসতির সংখ্যা পৃথিবীতে কম। আমাদের দেশের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ভারতের দার্জিলিং প্রভৃতি পাহাড়ি বসতির উদাহরণ।
৩. সমতল বসতি: সমতল ভূমিতে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে সমতল বসতি বলে। জীবনযাপন সহজ বলে পৃথিবীতে এই ধরনের বসতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন- বাংলাদেশের প্লাবন সমভূমির বসতি।

গ. আকৃতি অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: আকার অনুসারে বসতিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. দণ্ডবসতি: যাতায়াতের সুবিধার্থে যখন কোনো বসতি নদী বা রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠে তখন তাকে দণ্ডবসতি বলে। যেমন- নারাণগঞ্জের আড়াইহাজার পৌরসভার বসতি।

২. সমকোণী বা স্থূলকোণী বসতি: যে স্থানে দুই বা তিনটি রাস্তা পরস্পরের সাথে সমকোণে বা ইংরেজি 'Y'
আকারে মিলিত হয়, তখন সেখানে গড়ে ওঠা বসতি হচ্ছে সমকোণী বা স্থূলকোণী বসতি। যেমন-ময়মনসিংহের সদর পৌরসভার বসতি।
৩. চৌমাথা বসতি দুটি রাস্তা পরস্পরকে ছেদ করলে ঐ সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা বসতিকে চৌমাথা বসতি বলে। শহর অঞ্চলে এই বসতি বেশি লক্ষ করা যায়। যেমন- ঢাকার মালিবাগ, গাজীপুরের জয়দেবপুর।
৪.বৃত্ত বসতি: মূলত নিরাপত্তার কারণে কোনো একটি নিরাপদ ঘাঁটি বা স্থানকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে বৃত্তাকার বসতি বলে। বাংলাদেশের চরাঞ্চলে এখনও এরূপ কিছু বসতি দেখা যায়। যেমন- শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ।

ঘ.বিন্যাস অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: বসতির বিন্যাস অর্থাৎ এর বাহ্যিক রূপের (out look) ওপর ভিত্তি করে বসতি পাঁচ প্রকার। যথা-

১. সারিবদ্ধ বসতি: যখন নদী বা প্রশস্ত সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে কোনো বসতি গড়ে ওঠে তখন তাকে সারিবদ্ধ বসতি বলে। যেমন- মৌলভীবাজার শহরে মনু নদীর তীরবর্তী বসতি।
২. অনুকেন্দ্রিক বসতি কোনো একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে বৃত্তাকারে কোনো বসতি গড়ে ওঠলে তাকে অনুকেন্দ্রিক বসতি বলে। ভারতের গয়া, কাশী; সৌদি আরবের মক্কা প্রভৃতি অঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
৩. সংঘবদ্ধ বসতি যখন একটি স্থানে অনেকগুলো পরিবার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে বসবাস করে তখন তাকে সংঘবদ্ধ বসতি বলে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
৪. বিক্ষিপ্ত বসতি: কোনো বসতির মধ্যে কৃষিভূমি, বড় উন্মুক্ত জলাশয়, বনভূমি প্রভৃতির বাধা থাকলে সেখানে একটি পরিবার অন্যটি থেকে দূরে অবস্থান করে। এই ধরনের বসতিকে বিক্ষিপ্ত বসতি বলে। কানাডা, ডি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খামার বসতি এই ধরনের বসতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
৫. বিচ্ছিন্ন বসতি: কোনো অঞ্চলে বসতিগুলো সুনির্দিষ্ট কোনো বিন্যাস লাভ না করে এলোমেলোভাবে গড়ে উঠলে তাকে বিচ্ছিন্ন বসতি বলে। আমাদের দেশে পাহাড়ি ও হাওর অঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।

ঙ.পেশা অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: অধিবাসীদের পেশা বা জীবিকার ওপর ভিত্তি করে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে পেশাভিত্তিক 'বসতি বলে। এক্ষেত্রে একই পেশার মানুষজন একত্রে বসবাস করতে পছন্দ করে। যেমন- কৃষক, কুমোর, তাঁতি, জেলে প্রভৃতি পেশার লোকজন স্বতন্ত্র বসতি গড়ে তোলে। বাংলাদেশের পদ্মা নদীর তীরে বড় বড় জেলে গ্রাম দেখা যায়।

চ. জনসংখ্যার আকার অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: কোন বসতিতে কতজন মানুষ বসবাস করে তার ওপর ভিত্তি করে বসতিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১. খামার বসতি: কোনো একটি কৃষি জমিকে কেন্দ্র করে এক বা একাধিক পরিবার মিলে যে বসতি গড়ে তোলে তাঁকে খামার বসতি বলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
২. পাড়া: সাধারণত অল্প কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পাড়া গড়ে তোলে। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক পাড়া আছে।
৩. ক্ষুদ্রগ্রাম: কয়েকটি পাড়ার সমন্বয়ে একটি ক্ষুদ্রগ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের চরাঞ্চলে (যেমন-চরফ্যাশন, মনপুরা) অনেক ক্ষুদ্রগ্রাম দেখা যায়।
৪. বড় গ্রাম: অনেকগুলো পাড়া নিয়ে একটি বড় গ্রাম গঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে অনেক বড় গ্রাম আছে। এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(The Rural Settlement of Bangladesh)

প্রথম পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর ভিত্তি করে কোনো জনগোষ্ঠী যে বসতি গড়ে তোলে তাকে গ্রামীণ বসতি বলে। অর্থাৎ ফসল উৎপাদন, পশুপালন, মৎস্য চাষ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর বসতিই হচ্ছে গ্রামীণ বসতি। সহজভাবে বলা চলে, গ্রামাঞ্চলের মানুষের তৈরি বসতি গ্রামীণ বসতি।
বাংলাদেশ একটি গ্রাম প্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তাই গ্রামীণ বসতি সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মানচিত্রে বাংলাদেশের গ্রামীণ বসতির ধরনগুলো চিহ্নিত করে দেখানো হয়েছে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Classification of Rural Settlement in Bangladesh)

সাধারণভাবে প্রাথমিক উপজীবিকার ওপর নির্ভরশীল কোনো জনগোষ্ঠীর বসতিকে গ্রামীণ বসতি বলা হয়। এ ধরনের বসতির অধিবাসীরা প্রধানত কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ শিকার, বৃক্ষ কর্তন প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত থাকে। বাংলাদেশে ৬৩% লোক গ্রামে বাস করে (UN Population Devision's World Urbarization Prospects: 2018 Revision)। নিচে বাংলাদেশের গ্রামীণ বসতির শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলো।

১.পল্লীবসতি: অতি ক্ষুদ্রাকার জনবসতিকে পল্লীবসতি বলে। প্রধানত ৩ হতে ৫টি বাড়ি নিয়ে এই বসতি গঠিত।

বৈশিষ্ট্য:

১. অধিবাসীদের জীবনযাত্রা খুবই নিম্নমানের।
২. বাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ অর্থাৎ মাটি বা চাটাই দ্বারা তৈরি।
অবস্থান: বাংলাদেশের পাহাড়িয়া ও চর অঞ্চলে এ শ্রেণির, বসতি দেখা যায়।

২. গ্রাম্য বসতি: অপেক্ষাকৃত বৃহৎ পল্লীবসতিকে গ্রাম্য বসতি বলে।

বৈশিষ্ট্য:

১. এতে অধিক সংখ্যক বাড়ি থাকে।
২. এ বসতির অধিকাংশ বাড়িঘর বাঁশ, ছন বা মাটির তৈরি।
৩. মাঝে মাঝে ইট বা টিনের তৈরি বাড়িও দেখা যায়।
৪. এটি পল্লীবসতির চেয়ে উন্নত।

অবস্থান: বাংলাদেশের নদী তীরবর্তী অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই এ শ্রেণির বসতি দেখা যায়। যেমন: শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী আগুয়ান্দী গ্রাম।

৩. বিক্ষিপ্ত বসতি: বিক্ষিপ্ত বসতি বলতে এমন একটি বসতিকে বোঝানো হয় যেখানে দুই বা তিনটি ঘরের অবস্থান থাকে যা এক বা দুইটি পরিবারের ৫/৭ জনের আবাসস্থল।
বৈশিষ্ট্য:

১. কৃষি জমির মাঝখানে এ ধরনের বসতি গড়ে ওঠে।
২. এ ধরনের বসতিতে দুই থেকে চারটি বাড়ি থাকতে পারে।
৩. পরিবারের আকার বাড়ার কারণে দেশে বিক্ষিপ্ত বসতির সংখ্যা বাড়ছে।

অবস্থান: বাংলাদেশের প্লাবন সমভূমির প্রায় সব জায়গায় বিক্ষিপ্ত বসতির প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী; পাবনা, নোয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের বসতি অধিক।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও ধলেশ্বরী প্লাবন ভূমি এবং সিলেটের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে এ বসতি দেখা যায়।

৪. নিবিড় বসতি (পুঞ্জিভূত বসতি): কোনো বিশেষ সুবিধার জন্য যখন কোনো স্থানে অনেকগুলো বাড়ি একত্রে অবস্থান করে তখন তাকে নিবিড় বসতি বলে।

বৈশিষ্ট্য:
১. উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থা দেখা যায়।
২. বসতিগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে।
৩. শিক্ষার হার ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো।
৪. এ ধরনের বসতিতে সমবায় কৃষি পদ্ধতি দেখা যায়।
৫. ২০০-৪০০ পরিবার একসাথে বাস করে।

অবস্থান: সিলেটের পাহাড়িয়া অঞ্চল। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা শান্তি বাহিনীর ভয়ে এ ধরনের বসতি গড়ে তুলেছিল যা এখনও টিকে রয়েছে। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর এবং মধুপুরে এ ধরনের বসতি দেখা যায়।,

৫. সারিবদ্ধ বসতি: যে বসতিগুলো পাশাপাশি অবস্থিত হয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন সারি (Line) সৃষ্টি করে তাকে সারিবদ্ধ বসতি বলে। এ ধরনের বসতি কখনও কখনও ৫/৬ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। একে রৈখিক বসতিও বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

১. এ ধরনের বসতি দীর্ঘ সময় নিয়ে গড়ে ওঠে।
২. সেবা সুবিধা (বাজার, শিক্ষা) সুবিধাজনকভাবে গড়ে তোলা যায় না।
৩. অধিবাসীদের সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তোলা কঠিন হয়।

অবস্থান: বাংলাদেশের ছোট বড় সব নদীর তীরে এবং রেললাইন ও রাস্তার পাশে প্রধানত এ বসতি দেখা যায়। মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ অঞ্চলে সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীসমূহ খুব একটা সক্রিয় নয়। তাই নদীর দুই পাড়েই সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়। সিলেটের চা বাগান অঞ্চলে ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়।

৬. গোলাকার বসতি শুষ্ক অঞ্চলের কোনো ঝরণা বা হ্রদ বা অন্য কোনো আকর্ষণীয় স্থানের চারপাশে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে গোলাকার বসতি বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:
১. বিল ও ডোবা এলাকায় গোলাকার বসতির প্রাধান্য বেশি।
২. ধর্মীয় উপাসনালয়কে ঘিরে অনেক সময় এ ধরনের বসতি গড়ে ওঠে।

অবস্থান: বাংলাদেশের দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার ডাকাতিয়া বিল ও রাজশাহীর চলন বিলে এ ধরনের বসতি দেখা যায়।
শিল্পের অনগ্রসরতা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বাংলাদেশে গ্রামীণ বসতি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এছাড়া ব-দ্বীপ গঠিত প্লাবন সমভূমি, পাহাড় ও উচ্চভূমির অবস্থান, নদ-নদীর আধিক্য ও হাওড়-বাওড় ইত্যাদির উপস্থিতি এদেশের গ্রামীণ বসতির গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Characteristics of Rural Settlement in Bangladesh)

যে বসতির অধিকাংশ মানুষ প্রথম পর্যায়ের অর্থনৈতিক বা কৃষিনির্ভর কর্মকাণ্ডকে জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নেয় তাকে গ্রামীণ বসতি বলে। তাই কিছু কিছু বিষয়ের দিক দিয়ে এ বসতি, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বাংলাদেশে গ্রামীণ বসতির সংখ্যাই বেশি। তাই বাংলাদেশের বসতি সম্পর্কে জানতে হলে এদেশের গ্রামীণ বসতির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা জরুরি।

নিচে বাংলাদেশের গ্রামীণ বসতির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হলো-

i. এ বসতি অনেক বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত;
ii. কৃষি এখানকার মানুষের প্রধান উপজীবিকা;
iii. এই বসতির সুনির্দিষ্ট আকার ও আয়তন নেই;
iv. এ বসতিতে যৌথ পরিবারের সংখ্যা বেশি; বসতির অধিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক হৃদ্যতা বেশি থাকে;

vi. এ বসতির যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত;
vii. অধিকাংশ মানুষ স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত;
viii. অধিবাসীদের মধ্যে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব দেখা যায়;
ix. এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিনোদন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে; পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই;
xi. বাল্যবিবাহ ও বহু বিবাহের হার বেশি;
vii. নানাবিধ কুসংস্কার প্রচলিত;
xiii. ঘরবাড়ির নির্মাণ উপকরণ প্রধানত মাটি, খড়, টিন, ইট, ছন, গোলপাতা, বাঁশ প্রভৃতি;
xiv. কেন্দ্রীয়ভাবে নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই; এবং
xv. বসতিগুলো নানাবিধ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। যেমন- গাছ-পালা, মাটি, নদী ইত্যাদি।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Rural Hut-Bazar of Bangladesh)

মানুষ সমাজে বাস করে। পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ে ওঠে। একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকার সব উপকরণ নিজেই উৎপাদন বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। কোনো এক বা একাধিক উপকরণ হয়তো সে বাড়তি উৎপাদন করতে পারে কিন্তু অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহের জন্য তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজের উদ্বৃত্ত পণ্য অন্যের সাথে বিনিময় করে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে আসছে। উদ্বৃত্ত পণ্য ও সেবার এই বিনিময় প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে গ্রামীণ হাট-বাজার।

হাট মূলত গ্রামেই গড়ে ওঠে। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় এর ভূমিকা অসামান্য। শহরে পাড়ায় পাড়ায় বা মহল্লায় মহল্লায় পর্যাপ্ত দোকান-পাট থাকার কারণে পৃথক হাটের কোনো গুরুত্ব নেই। তাই শহরে হাট দেখা যায় না বললেই চলে।
হাট এর সংজ্ঞা: হাট বলতে সাধারণ অর্থে আমরা এমন একটি স্থানকে বুঝি যেখানে পণ্য সামগ্রী বেচাকেনা হয়ে থাকে। এটি হচ্ছে এমন একটি নির্দিষ্ট স্থান, যেখানে কিছু সংখ্যক ক্রেতা ও বিক্রেতা একটি নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয় এবং পণ্যের বিনিময় করে। অর্থাৎ, নিয়মিত বিরতিতে গ্রামে যে বাজার বসে তাই হাট। ('A market, especially one held on a regular basis in a rural area. - Oxford Dictionaries)।

গ্রামের লোকদের ক্রয়ক্ষমতা ও উদ্বৃত্ত পণ্য সাধারণত কম হওয়ার কারণে হাট প্রতিদিন বসে না। সাধারণত সপ্তাহের একটি বা দুটি নির্দিষ্ট দিনে হাট বসে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা এতেই মিটে যায়। সপ্তাহের অন্যান্য সময় এ স্থান তাই ফাঁকা থাকে।
গ্রামীণ হাটের বৈশিষ্ট্য: গ্রামীণ জীবনযাত্রায় হাট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের সব গ্রামে হাট না বসলেও অধিকাংশ বড় গ্রামে হাট বসে। গ্রামীণ হাটের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেমন-

i. গ্রামীণ হাট সাধারণত সপ্তাহের নির্দিষ্ট এক বা দুইদিন বসে। সপ্তাহের অন্যান্য দিন এ স্থান ফাঁকা থাকে।
ii. পরস্পর নিকটবর্তী হাটসমূহে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এড়ানোর জন্য একধরনের সমঝোতার মাধ্যমে হাট বসার দিন-ক্ষণ নির্ধারিত হয়। অনিয়মিত বিক্রেতারা হাটের কোনো উন্মুক্ত স্থানে তাদের পণ্য বিক্রয় করে থাকে।
iii. অপেক্ষাকৃত সমতল ও বন্যামুক্ত জমিতে হাট গড়ে ওঠে, যাতে লোকজনের যাতায়াত ও পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ে কোনো সমস্যা না হয়।
iv. পণ্য-দ্রব্য নেওয়া এবং ক্রেতা-বিক্রেতার যাতায়াতের সুবিধাকে মাথায় রেখে কোনো সুবিধাজনক জায়গায় হাট গড়ে ওঠে।
V. বিক্রেতারা অনেক দূরদূরান্ত থেকে এলেও ক্রেতারা নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে আসে।
vi. সাধারণত বিক্রেতার জন্য অস্থায়ী ছাউনী থাকে। তবে বর্তমান সময়ে অনেক বড় হাটে স্থায়ী দোকান ও গুদামঘর দেখতে পাওয়া যায়। 1
vii. নির্বাচনী প্রচারণা বা সরকারি-বেসরকারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণায় গ্রামীণ হাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
viii. গ্রামীণ জীবনের মিলনমেলা হিসেবেও হাট কাজ করে থাকে।
ix. গ্রামীণ পটভূমিতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাটের যোগসূত্র থাকায় স্থানীয় প্রশাসনিক অবকাঠামোর আশপাশে হাট গড়ে ওঠে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Classification of Rural Hat)

ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, গ্রামীণ হাট সাধারণত সপ্তাহের এক বা দুইদিন বসে। তবে গ্রামীণ মানুষের চাহিদা এবং পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণের কথা বিবেচনা করে কোথাও কোথাও পণ্যের এই ক্রয়-বিক্রয় সপ্তাহের প্রতিদিন হয়। মূলত সপ্তাহে কতদিন পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হয় তার ওপর ভিত্তি করে গ্রামীণ হাটকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ক. সাপ্তাহিক হাট; ও খ. প্রাত্যহিক বাজার।

ক. সাপ্তাহিক হাট: যে সমস্ত গ্রামীণ-হাট সপ্তাহে মাত্র একদিন অথবা সর্বোচ্চ দুইদিন বসে তাকে সাপ্তাহিক হাট বলে। সাপ্তাহিক হাট সাধারণত দুপুর থেকে বসতে শুরু করে এবং অনেক রাত পর্যন্ত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় চলে। তবে দুপুর দুইটার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বাধিক লোকের সমাগম ঘটে। বাংলাদেশে সপ্তাহে দুইদিন বসে এমন হাটের সংখ্যা বেশি এবং এগুলো আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে।

বৈশিষ্ট্য: সাপ্তাহিক হাটের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
i. সপ্তাহের নির্দিষ্ট এক বা দুই দিন বসে;
ii. স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, এমন স্থানে এ হাট গড়ে ওঠে-
iii. আকারে অনেক বড় হয়ে থাকে;
iv. পাইকারি ও খুচরা পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়;
v. অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকের সমাগম হয়; এবং
vi. পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে সাথে এ হাট সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

খ. প্রাত্যহিক বাজার: কোনো গ্রামীণ রাস্তার পাশে অথবা বড় কোনো বৃক্ষের নিচে অথবা কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে যখন সপ্তাহের প্রতিদিন সীমিত পরিসরে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয় তখন তাকে প্রাত্যহিক বাজার বলে। অল্প সংখ্যক ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি থাকে বলে এই ধরনের বাজার আকারে ছোট হয়। গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যই বাজারে ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। এখানে বিক্রেতাদের কোনো নির্ধারিত বা স্থায়ী দোকান নাও থাকতে পারে।

বৈশিষ্ট্য: প্রাত্যহিক বাজারের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

i. গ্রামীণ রাস্তার পাশে গড়ে ওঠে;
ii.. গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার কথা মাথায় রেখে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়;
iii. প্রধানত পচনশীল পণ্যদ্রব্য (যেমন- মাছ, শাকসবজি প্রভৃতি) কেনাবেচা হয়;
iv. কোনো স্থায়ী দোকান ঘর থাকে না। এমনকি অনেক দোকানে কোনো ছাউনিও থাকে না;
v. সাধারণত সকালে শুরু হয় এবং দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়; এবং.
vi. মহাসড়কের পাশে যে সমস্ত বাজার অবস্থিত সেই সমস্ত বাজার যাত্রীদের চাহিদার কারণে অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Importance of Rural Hat)

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বগাস করে। এখানে যাতায়াত ব্যবস্থা তেমন ভালো থাকে না। গ্রামীণ সমাজে চাইলেই প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায় না। এ প্রেক্ষিতে গ্রামীণ হাট মানুষের সব ধরনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। এমনকী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে থাকে। গ্রামীণ পরিসরে হাটের ব্যাপক ভূমিকার কারণে এর গুরুত্ব কয়েকটি শিরোনামে আলোচনা করা যেতে পারে।

১. কেন্দ্রীয় সেবা: পণ্যদ্রব্য আনা নেওয়ার সুবিধার জন্য গ্রামের মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় জায়গা হাটের জন্য নির্ধারিত হয়। এর ফলে একটি হাটের সুবিধা পার্শ্ববর্তী ৪/৫ টি গ্রামের লোকজন পেয়ে থাকে।
২. নিত্য ব্যবহার্য পণ্য ক্রয়-বিক্রয়: গ্রামের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকে না বলে নিজেদের উদ্বৃত্ত ও প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য হাট একমাত্র স্থান। এক হাটে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করতে না পারলে তাকে পরবর্তী হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে গ্রামে হাট যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
৩. পণ্যের প্রসার: গ্রামীণ হাটের মাধ্যমেই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য শহরাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়। কোনো অন্যলে কোনো পণ্যদ্রব্যের বা শাকসবজির ঘাটতি দেখা দিলে, তা উদ্বৃত্ত অঞ্চলের হাট থেকে নিয়ে প্রয়োজন মেটানো হয়। এভাবে কৃষি পণ্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে গ্রামীণ হাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৪. অর্থনৈতিক গুরুত্ব: গ্রামে বসবাসকারী মানুষ তাদের উদ্বৃত্ত উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী গ্রামীণ হাটের মাধ্যমে বিক্রয় করে থাকে। এভাবে অর্জিত অর্থের সাহায্যে তারা তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসমূহ ক্রয় করে থাকে। অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতিতে হাটের গুরুত্ব খুব বেশি।
৫. প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎস: এমন কিছু পণ্য-সামগ্রী আছে যেগুলো স্থানীয়ভাবে গ্রামে উৎপাদিত হয় না; যেমন-- লবণ, কাপড়, শাড়ি, ওষুধ, অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি-পাতিল, বাতি, দিয়াশলাই প্রভৃতি। এই সমস্ত দ্রব্য সামগ্রী পেতে গ্রামের মানুষদেরকে হাটের উপর নির্ভর করতেই হয়।
৬. নানাবিধ কর্মকান্ডের কেন্দ্র: গ্রামীণ হাটে মানুষ কেবল পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করতে যায় না। বিশেষ কারো সাথে দেখা বা যোগাযোগ করা, জমিজমা সংক্রান্ত কাজ অথবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ প্রভৃতি কারণেও তাদের কাছে হাট অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

৭. সামাজিক/সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: গ্রামীণ হাটে অনেক লোকের সমাগম ঘটে। এতে কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে নতুন নতুন কৌশল এবং কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা, সমাধান ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এতে জ্ঞানের বিনিময় ঘটে। অনেক বিবাদের মীমাংসা হাটে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। এখানে যে চায়ের দোকান থাকে সেখানে বন্ধু বান্ধব, সঙ্গী সাথীদের সাথে গল্পগুজব ও আড্ডা জমে ওঠে। মাঝে মধ্যে হাটে সার্কাস, ম্যাজিক শো, যাত্রাপালা প্রভৃতির আসর বসে। এগুলো গ্রামের মানুষের চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Urbanization in Bangladesh: History and Charecteristics)

বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ হলেও এদেশে নগরায়ণের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন। প্রাচীনকালের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, এদেশের বগুড়ার মহাস্থানগড়ে পুণ্ড নামক নগর ছিল। মুঘল আমলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ-এ বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয়। এখানকার পানামা নগর-এ আধুনিক নগর ব্যবস্থার সকল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ১৬১০ সালে ঢাকা জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিল এবং বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলার প্রথম জেলা হিসাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যশোর শহর এর পত্তন ঘটে।

পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের পূর্বে আমাদের দেশে সতেরোটি বৃহত্তর জেলাসহ নব্বইটির মতো শহর ছিল। নগর জনসংখ্যার হার ছিল ১০% এর নিচে। স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত শতাব্দীর ৯০ এর দশকের পর থেকে নানাবিধ কারণে বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যার হার যেমন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে নগরের সংখ্যাও। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০০ এর বেশি নগর রয়েছে এবং নগর জনসংখ্যার হার দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ (সূত্র: বিশ্বব্যাংক-২০১৮)।

বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান হারে নগরায়ণ হচ্ছে। দেশের সব জেলা সদর তো বটেই প্রায় সকল উপজেলা সদর এমন কি অনেক বড় বড় গঞ্জ বা হাটও আজ শহরে পরিণত হচ্ছে। মানুষ কৃষি পেশা পরিত্যাগ করে অকৃষি পেশা গ্রহণ করছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। তবে অতি দ্রুত নগরায়ণ হওয়ার ফলে কোথাও পরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে তোলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের নগরায়ণের বৈশিষ্ট্য

অপরিকল্পিত নগরায়ণ: বাংলাদেশে নগর প্রতিষ্ঠায় কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। প্রশাসনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে এবং মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে যত্রতত্র নগর গড়ে উঠছে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
নগর জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি: গত ত্রিশ বছরে নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যার হার বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে যেখানে ২% এর নিচে সেখানে বড় শহরগুলোতে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১০% এর বেশি। শহরে নাগরিক সুবিধা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় গ্রাম থেকে মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে এবং স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শহরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়ছে।

সকল কর্মক্ষেত্র নগরকেন্দ্রিক: বাংলাদেশের সমস্যা হলো, নগর ও গ্রাম জীবনের জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য অনেক বেশি। এদেশের বড় বড় অফিস-আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি অনেক ছোট-বড় কারখানাও শহরকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে।

যত্রতত্র নগর প্রতিষ্ঠা; কোনো স্থান বা বসতি নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে কতকগুলো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সব সময় তা মানা হয় না। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বা অন্য কোনো কারণে এমন সব বসতিকে নগর হিসেবে (পৌরসভা) ঘোষণা করা হয়, যা নগর হওয়ার উপযুক্ত হয়নি। ফলে সেই সমস্ত নগরে জীবনযাত্রার মান কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায় না।

পেশার পরিবর্তন ও নগরায়ণ: বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত নব প্রজন্ম পিতৃপুরুষের কৃষি পেশায় ফিরে যেতে চাইছে না। ফলে কাজের সুবিধার্থে তারা শহরে বসতি গড়তে চাচ্ছে। শুরু হচ্ছে নতুন করে নগরায়ণ প্রক্রিয়া।

নগরকেন্দ্রিক মানসিকতা: আমাদের মানসিকতা এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, আমরা যা কিছু ভালো ও উন্নত তার সবকিছুই নগরকেন্দ্রিক করে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিংমল, বিনোদন কেন্দ্র সবকিছুই নগরকেন্দ্রিক হতে হবে। এই মানসিকতা ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের অন্যতম কারণ।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Urban Areas in Bangladesh: Definition and Charecteristics)

বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। এদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গ্রাম ভিত্তিক। তাই বাংলাদেশে নগর ব্যবস্থা খুব বেশি উন্নত হয়নি। স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা ছিল ১০ শতাংশেরও কম। অবশ্য স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর নব্বই এর দশক থেকে এদেশে নগর জনসংখ্যা নানাবিধ কারণে নাটকীয় হারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে নগরের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে নগর জনসংখ্যার হার। এ কারণে নগরায়ণ বর্তমান সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

নগর-এর সংজ্ঞা: প্রথমেই আমাদের জানতে হবে নগর বা নগরায়ণ বলতে আমরা কী বুঝি? নগর ও নগরায়ণ এক জিনিস নয়। সাধারণভাবে কোনো একটি জায়গায় উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে এ ধরনের বসতিকে নগর বলে। তবে নগর হিসেবে বিবেচনার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য পরিমাপক সংজ্ঞা আছে। সেটি হচ্ছে- “কোনো এলাকার অধিকাংশ অধিবাসী যদি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে এবং সে এলাকা পরিচালনার জন্য একটি প্রশাসন ব্যবস্থা থাকে, জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকি.মি. এ ৫০০ জন এর বেশি হয়, তবে সেই এলাকাকে বা সেই বসতিকে নগর বলে।”

নগরের বৈশিষ্ট্য: একটি জনবসতি নগর হিসাবে পরিগণিত হবে কিনা অর্থাৎ সেই বসতিকে নগর বলা যায় কিনা তা নির্ভর করে কতকগুলো বৈশিষ্ট্যের উপর। নগরের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-

i.অধিকাংশ অধিবাসী (৭০% এর বেশি) অকৃষিমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত।
ii.জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি কি.মি. এ ৫০০ বা এর বেশি।
iii.মোট অধিবাসীর সংখ্যা কমপক্ষে ৫,০০০ জন।
iv.নগর পরিচালনার জন্য প্রশাসন ব্যবস্থা থাকবে।
V.কেন্দ্রীয়ভাবে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা থাকে।
vi.উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে।
vii.অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট পাকা থাকে।
viii.পর্যাপ্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থাকে।
ix.নাগরিকদের বিনোদনের উত্তম ব্যবস্থা থাকে।

x.নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় হার অপেক্ষা বেশি থাকে।

উপরের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো যদি কোনো বসতির মধ্যে দেখা যায়, তবে তাকে নগর বলে গণ্য করা হবে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Classification of Urban Areas in Bangladesh)

বাংলাদেশে ৫০০ এর বেশি ছোট বড় শহর আছে। কিন্তু সব শহর সমান বড় বা সুবিধাসম্পন্ন নয়। কোনো শহরে জনসংখ্যা কত তার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের নগরসমূহকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথা:

নিম্নে এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

ক. শহর (Town): কোনো বসতিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমপক্ষে ৫০০ জন (প্রতি বর্গ কি.মি.) হলে এবং মোট অধিবাসীদের বেশির ভাগ বা ৯০% এর বেশি অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকলে এবং মোট জনসংখ্যা ১ লক্ষের কম হলে সেই বসতিকে শহর বলে। শহর গ্রাম অপেক্ষা বড়। সাধারণত বড় কোনো গঞ্জ বা নদীবন্দর বা হাট কালক্রমে শহরে পরিণত হয়। শহরে প্রশাসনিক ভবন, বিভিন্ন অফিস আদালত, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। বাংলাদেশের সকল পৌরসভাকে শহর হিসেবে ধরা যায়।

খ. নগর (City): শহর অপেক্ষা নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বেশি। এক লক্ষের বেশি লোকের আবাসস্থলবিশিষ্ট শহরকে নগর বলে। বাংলাদেশের সকল পুরাতন জেলাশহর (যেমন- যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভৃতি) এবং অনেক নতুন জেলা শহর (নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি) নগর হিসেবে স্বীকৃত।

গ. মহানগর (Metropolis): যে নগরে জনসংখ্যা ১০ লক্ষের বেশি তাকে মহানগর বলে। মহানগরের আয়তন, প্রভাবাধীন এলাকা, কর্মক্ষেত্র এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নগর অপেক্ষা অনেক বেশি। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী প্রভৃতি বিভাগীয় শহর মহানগরী হিসেবে পরিচিত। মহানগরের জীবনযাত্রার মান অনেক বেশি উন্নত।

ঘ. মেগাসিটি (Mega city): কোনো নগরের জনসংখ্যা ৫০ লক্ষের বেশি হলে তাকে মেগাসিটি বলে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একটি মেগাসিটি। সবদিক দিয়ে মেগাসিটি অন্যান্য নগর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

ঙ. কনারবেশন (Conerbation): পাশাপাশি দুটি মহানগরী আয়তনে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে পরস্পর যুক্ত হলে তাকে কনারবেশন বা নগরপুঞ্জ বলে। বাংলাদেশে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ উভয় নগর সম্প্রসারিত হয়ে কনারবেশন সৃষ্টি করেছে। তবে লক্ষণীয় যে, কনারবেশনে উভয় নগরীর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ পৃথক হয়।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Major Cities of Bangladesh)

আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে, বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। উন্নত দেশের ন্যায় আমাদের দেশে পরিকল্পিত নগর তেমন দেখা যায় না। আমাদের দেশে প্রায় ৫০০ ছোট বড় শহর আছে। এই সমস্ত শহরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বা প্রধান নগরসমূহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো।ঢাকা: ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী এবং প্রধান ও বৃহত্তম শহর। ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা প্রায় ১৯ মিলিয়ন। জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শহর। ঢাকা শহরে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বোটানিক্যাল গার্ডেন, শিশুপার্ক, শপিংমল, বিনোদন কেন্দ্রসহ অনেক প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে।

ময়মনসিংহ: বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শহর। এটি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ শহরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সেনানিবাস, গার্লস ক্যাডেট কলেজ আছে। বর্তমানে এটি বিভাগীয় শহর।

টাঙ্গাইল: শাড়ির জন্য বিখ্যাত টাঙ্গাইল শহর। এখানে প্রাচীন জমিদার বাড়ি এবং একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

ফরিদপুর: পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত অন্যতম বৃহৎ শহর। এখানে একটি মেডিকেল কলেজ আছে।
নারায়ণগঞ্জ: শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান বন্দর। এটি এক সময় পাটশিল্পের জন্য বিশ্ব বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে শহরটিতে অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। দেশের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত।

নরসিংদী: ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত নরসিংদী মূলত বস্ত্র শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এই শহরে অনেক পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। শহরের সন্নিকটে অবস্থিত বাবুরহাট দেশের অন্যতম প্রধান বস্ত্র বাণিজ্য কেন্দ্র।
চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় প্রধান নগর এবং প্রধান ও বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর। এটি একটি প্রাচীন শহর এবং বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। এই শহরে শিল্পকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, সমুদ্রবন্দর, সমুদ্র সৈকত, বিমানবন্দর প্রভৃতি আছে। পাহাড় ও সাগরের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য অপূর্ব।`

নোয়াখালি: বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত জেলাশহর। যদিও নদী-ভাঙনে বর্তমান জেলাশহর মাইজদিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখানে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

কুমিল্লা: গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত কুমিল্লা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শহর। সম্প্রতি শহরটিকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়েছে। শহরে সেনানিবাস, শিক্ষা বোর্ড, ক্যাডেট কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক দর্শনীয় স্থাপনা রয়েছে।
সিলেট: সিলেট শহর সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত। সুপ্রাচীন এই শহরকে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ বলা হয়। ইতিহাসখ্যাত মুসলিম সাধক হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজার এই শহরে অবস্থিত। এছাড়া চা শিল্পের জন্য এই শহরের পৃথক খ্যাতি আছে। নয়নাভিরাম চা বাগান, ক্যাডেট কলেজ, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর প্রভৃতি এই শহরকে সমৃদ্ধ করেছে।

রাজশাহী: বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম শহর রাজশাহী। এটি পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত একটি বিভাগীয় শহর। এক সময় শিক্ষা নগরী হিসাবে রাজশাহীর খ্যাতি ছিল। রেশম শহর হিসাবেও এটি বিখ্যাত। এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাডেট কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রভৃতি অবস্থিত l

রংপুর: তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত অন্যতম প্রধান শহর। সম্প্রতি শহরটিকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা হয়েছে। এটি একটি বিভাগীয় শহর। রংপুর তামাক শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

বগুড়া: উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শহর। শহরের অদূরে মহাস্থান নামক স্থানে প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। শহরে একটি মেডিকেল কলেজ আছে।

দিনাজপুর: এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান শহর। শহরে একটি মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রামসাগর ও কান্তজীর মন্দির নামক দুটি দর্শনীয় জায়গা আছে।

খুলনা: বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগর খুলনা একটি বিভাগীয় শহর। এটি রূপসা ও ভৈরব নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। ১। এক এক সময় সময় খুলনা শিল্প নগরী হিসাবে খ্যাত ছিল। বর্তমানে শহরে বেশ কিছু শিল্প কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, হাসপাতাল প্রভৃতি আছে।

যশোর: বাংলাদেশের প্রাচীনতম জেলাশহর যশোর। যশোর ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত। বেনাপোল স্থলবন্দরের অবস্থান যশোর এর গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর ও শিক্ষাবোর্ড আছে।

কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়া শহর গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত। এই শহর এক সময় বস্ত্র শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। শহরে একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়াও শহরের অদূরে রবীন্দ্রনাথের কুঠি বাড়ি, লালনের আখড়া প্রভৃতি দর্শনীয় জায়গা এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

বরিশাল: বরিশাল বাংলাদেশের পঞ্চম বিভাগীয় শহর। এটি কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত। বরিশাল একটি প্রাচীন শহর। শহরটিতে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবোর্ড, মেডিকেল কলেজ, বৃহৎ নদী বন্দর প্রভৃতি স্থাপনা আছে।

পাবনা: দেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা শহর। এখানে ক্যাডেট কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এদেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতাল পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

Bangladesh by Square and Circular Methods And Differentiation of Urban Population)

বৃত্ত বা বর্গ সম্বলিত মানচিত্র পরিসংখ্যান উপাত্ত উপস্থাপনের একটি কৌশল। জনসংখ্যা, ভূমি ব্যবহার, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ইত্যাদি আনুপাতিক হারে প্রদর্শনের জন্য এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। মানচিত্রে বৃত্তলেখ, বর্গলেখ, চক্রলেখ, স্তম্ভলেখ, গোলকলেখ, রৈখিকলেখ ইত্যাদি দেখানো হয়ে থাকে।

জনসংখ্যা প্রদর্শনের জন্য শহরের কেন্দ্রস্থলে বৃত্ত অথবা বর্গ অঙ্কন করতে হবে। বৃত্ত কিংবা বর্গের আয়তন যাই হোক তার কেন্দ্রস্থলটি শহর বা নগরের কেন্দ্রস্থলে থাকা উচিৎ।

বর্গ মানচিত্রের উদাহরণ ও অঙ্কন পদ্ধতি

বর্গ মানচিত্রে জনসংখ্যা প্রদর্শনের জন্য কোনো অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা এবং ঐ অঞ্চলের শহর কিংবা গ্রামীণ জনসংখ্যার পরিসংখ্যান থেকে আসন্ন পূর্ণসংখ্যা ও পূর্ণসংখ্যার বর্গমূল বের করতে হবে। অতঃপর প্রাপ্ত বর্গমূল থেকে প্রতি ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে নির্দিষ্ট সংখ্যা ধরে বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হবে।
আনুপাতিক বর্গক্ষেত্রের জন্য প্রথমে অঞ্চল, বিভাগ বা জেলার জনসংখ্যার বর্গমূল ও বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করার পর শহর কিংবা গ্রামের জনসংখ্যার বর্গমূল ও তার বাহুর দৈর্ঘ্য বের করতে হবে। প্রথম বর্গটি অঙ্কনের পর অঙ্কিত বর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দ্বিতীয় বর্গটি অঙ্কিত হবে। নিম্নের সারণি ও তার ব্যাখ্যা থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

সারণি-৩.১: বাংলাদেশের নির্বাচিত পাঁচটি জেলা ও এগুলোয় নগরীয় জনসংখ্যা (সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী)

জেলার নামমোট জনসংখ্যানগরীয় জনসংখ্যা
ঢাকা১২০৪৩৯৭৭৬৯৭০১০৫
ময়মনসিংহ৫১১০২৭২২৫৮০৪০
ফরিদপুর১৯১২৯৬৯১২১৬৩২
টাঙ্গাইল৩৬০৫০৮৩১৬৭৪১২
জামালপুর২২৯২৬৭৪১৪২৭৬৪

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০১৬
উপরের উপাত্ত থেকে এবার বর্গচিত্র উপস্থাপনের হিসাব নির্ণয় করা হবে।

সারণি-৩.২: আনুপাতিক বর্গের হিসাব (জেলার ক্ষেত্রে) [স্কেল: প্রতি ইঞ্চিতে ২০০০ জন]

জেলার নামমোট জনসংখ্যাআসন্ন পূর্ণসংখ্যাপূর্ণসংখ্যার বর্গমূলস্কেল অনুসারে দৈর্ঘ্য
ঢাকা১২০৪৩৯৭৭১২০০০০০০৩৪৬৪ইঞিসে.মি.
ময়মনসিংহ৫১১০২৭২৫১০০০০০২২৫৮১.৭৩৪.৩৯
ফরিদপুর১৯১২৯৬৯১৯০০০০০১৩৭৮১.১৩৪.৩৯
ফরিদপুর৩৬০৫০৮৩৩৬০০০০০১৮৯৭০.৬৯১.৭৫
জামালপুর৩৬০৫০৮৩২২০০০০০১৪৮৩০.৯৫২.৪১
০.৭৪ ১.৮৮

সারণি-৩.৩: আনুপাতিক বর্গের হিসাব (নগরের ক্ষেত্রে) [স্কেল: প্রতি ইঞ্চিতে ২০০০ জন)

জেলার নামনগরীর জনসংখ্যাআসন্ন পূর্ণমানপূর্ণসংখ্যার বর্গমূলস্কেল অনুসারে দৈর্ঘ্য
ঢাকা৬৯৭০১০৫৭০০০০০০২৬৪৬ইঞ্চিসে.মি.
ময়মনসিংহ২৫৮০৪০৩০০০০০৫৪৮১.৩২৩.৩৫
ফরিদপুর১২১৬৩২১০০০০০৩১৬০.২৭০.৬৯
টাঙ্গাইল১৬৭৪১২২০০০০০৪৪৭০.১৬০.৪১
জামালপুর১৪২৭৬৪১০০০০০৩১৬০.২২০.৫৬
০.১৬০.৪১

বর্গগুলোর বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করার জন্য প্রতি ইঞ্চিতে ২০০০ জন ধরা হয়েছে। এভাবে জেলা ও নগরের জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে পরবর্তীতে মানচিত্রে বর্গক্ষেত্রগুলো অঙ্কন করা হয়েছে। মূল বর্গক্ষেত্রগুলো জেলার জনসংখ্যা এবং অন্তবর্তী বর্গক্ষেত্র শহরের জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী, যা মূল বর্গক্ষেত্রের দক্ষিণ পশ্চিম কোণ হতে অঙ্কিত। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা সর্বাধিক হওয়াতে অন্তবর্তী বর্গক্ষেত্র আয়তনে অনেক বড় এবং ফরিদপুর জেলার নগরী জনসংখ্যা নিতান্ত কম হওয়াতে অন্তর্বর্তী বর্গক্ষেত্রের আয়তনও অতি ক্ষুদ্র।

আনুপাতিক বর্গ মানচিত্রে প্রতিনিধিত্বকারী বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের সূত্র হলো: জনসংখ্যার আসন্ন পূর্ণমানের বর্গমূল/স্কেলে নির্ধারিত জনসংখ্যা

সূত্র অনুযায়ী, ঢাকা জেলার জনসংখ্যার আসন্ন পূর্ণসংখ্যার বর্গমূল ৩৪৬৪ এবং স্কেলে নির্ধারিত জনসংখ্যা প্রতি ইঞ্চিতে

২০০০ জন। এক্ষেত্রে বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য = ১.৭৩ ইঞ্চি বা ৪.৩৯ সে.মি.।

উপরিউক্ত নিয়মে প্রত্যেকটি অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ও নগরীর জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা হয়েছে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Practical: Map Drawing with Circular Method)

বিভিন্ন স্থানের জনসংখ্যার পরিমাণ আনুপাতিক হারে প্রদর্শনের জন্য আনুপাতিক বৃত্ত মানচিত্রে উপস্থাপন করা হয়। বৃত্ত প্রদর্শনের জন্য মোট জনসংখ্যার বর্গমূল করে প্রতি ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে একটি নির্দিষ্ট স্কেলে জনসংখ্যা ধরে বর্গমূলগুলোকে ভাগ দিলে '০' থেকে দূরত্ব পাওয়া যাবে। অতঃপর একটি আনুভূমিক রেখায় শূন্য থেকে বিন্দুগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত বিন্দুগুলোকে কেন্দ্র করে বৃত্তগুলো অঙ্কন করে মানচিত্রে যথাস্থানে তা উপস্থাপন করতে হবে। বৃত্ত মানচিত্রে অনেক সময় একটি বৃহৎ বৃত্ত অন্য একটি বৃত্তের এলাকা দখল করতে পারে। এজন্য যথাসম্ভব ব্যাসার্ধ কম নিতে হবে। বৃত্ত মানচিত্রে একটি বৃত্তকে ভাগ না করে প্রত্যেক বৃত্তের ব্যাসার্ধ নির্ণয় করা হয়।

বৃত্তের সাহায্যে জনসংখ্যা উপস্থাপনের জন্য নিচে একটি উদাহরণ দেয়া হল:

শহরজনসংখ্যা
১৭,০০০
১৯,০০০
৩০,০০০
৩৬,০০০
৪৫,০০০

মনে করি ১৫,০০০ লোকের জন্য একটি বৃত্তের ব্যাসার্ধ ১ সে.মি., তবে -

ক শহরের বৃত্তের ব্যাসার্ধ = ১.০ × = . সে.মি.

খ শহরের বৃত্তের ব্যাসার্ধ = ১.০ ×  = ১.১৩ সে.মি.

গ শহরের বৃত্তের ব্যাসার্ধ = ১.০ ×= ১.৪১ সে.মি.

ঘ শহরের বৃত্তের ব্যাসার্ধ = ১.০ ×= = ১.৫৫ সে.মি.

ঙ শহরের বৃত্তের ব্যাসার্ধ = ১.০ ×= ১.৭৩ সে.মি.

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত গ্রামভিত্তিক। কিন্তু ধীরে ধীরে ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে নগর বসতির প্রসার শুরু হয়। বাংলাদেশের নগর এলাকা বৃদ্ধিই হচ্ছে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সাধারণত নগরসমূহ বৃহৎ জনসংখ্যাবিশিষ্ট এবং ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের নগরসমূহে জনসংখ্যার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে বড় বড় অফিস আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু নগর কেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠছে। এমনকি অনেক ছোট বড় কারখানাও নগরের মধ্যে গড়ে উঠছে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে নগরে আসতে হয়। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, ভূপ্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়িয়া অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কারণ উচ্চ পার্বত্য এলাকা অপেক্ষা সমভূমিতে কৃষিকাজ সহজে করা যায় এবং মানুষের জীবনযাত্রা আরামদায়ক হয়। পাহাড়ি এলাকার ভূমি অসমতল হওয়ায় কৃষিকাজ করা তেমন সম্ভব হয় না। তাই এসকল অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Practical: Population Distribution in Cities of Bangladesh)

বাংলাদেশের নগরসমূহের মধ্যে কোনোটি মেগাসিটি, কোনোটি স্ট্যাটিসটিক্যাল মেট্রোপলিটন এরিয়া (SMA) কোনোটি পৌরসভা শহর। দেশের প্রধান প্রধান নগরগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ইত্যাদি। এসব নগরে বিভিন্ন কারণে জনসংখ্যার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে বাংলাদেশের বিভিন্ন নগরের জনসংখ্যার ভিন্নতা বর্ণনা করা হলো:

১. ঢাকা: ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের মেগাসিটির মর্যাদা প্রাপ্ত। মূলত বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন ও জনসংখ্যার পরিমাণের কারণে ঢাকা মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। World Population Review 2019 এর হিসেব অনুযায়ী ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা প্রায় ২১ মিলিয়ন। এত ক্ষুদ্র নগরে এত পরিমাণ জনসংখ্যার কারণ হচ্ছে মানুষের প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি। এছাড়া ঢাকা রাজধানী শহর এবং কর্মসংস্থানের অধিক সুযোগ থাকায় জনসংখ্যা অধিক।

২. চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম জনবহুল নগর। ঢাকার তুলনায় এই নগরে জনসংখ্যা কম হলেও অন্যান্য অনেক নগরের তুলনায় জনসংখ্যা অধিক। এখানে জনসংখ্যা অধিক হওয়ার কারণ হচ্ছে এটা দেশের বৃহত্তম বন্দরনগরী। চট্টগ্রাম নগরটি মেট্রোপলিটন শহর। ১৯৫১ সালে প্রায় ৩ লক্ষ জনসংখ্যা নিয়ে এই নগরী ছিল প্রথম শ্রেণির নগর। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মিলিয়ন প্লাস সিটির মর্যাদায় রয়েছে।

৩. খুলনা: খুলনা শহরও মেট্রোপলিটন সিটির মর্যাদায় রয়েছে। খুলনায় শিল্পায়নে স্থবিরতা ও মংলা সমুদ্র বন্দরের দূরত্বের কারণে এখানকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। ২০১১ সালের আদমশুমারি হিসেবে খুলনা নগর মিলিয়ন প্লাস সিটিতে উন্নীত হয়েছে।

৪. রাজশাহী: ১৯৭৪ সালে ১৩২,৯০৯ জনসংখ্যা নিয়ে রাজশাহী প্রথম শ্রেণির নগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজশাহী শহরের জনসংখ্যা ভিন্নতার কারণ হচ্ছে আশেপাশের জেলা শহরের তুলনায় রাজশাহী শহরের কর্মসংস্থান অধিক, সুযোগ সুবিধা বেশি ইত্যাদি। রাজশাহী নগর প্রাচীন নগরগুলোর মধ্যে একটি। ১৮৭৬ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজশাহী নগরের গুরুত্ব প্রকাশ পায়।

৫. সিলেট: ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী নগর জনসংখ্যার পরিমাণে সিলেট চতুর্থ। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, সমগ্র বাংলাদেশে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নগরগুলোতে সর্বাধিক। জন্মহার জনসংখ্যা নগরে বেশি প্রভাব ফেলে না বরং অভিগমন, মৌলিক প্রয়োজনীয়তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ ইত্যাদি কারণে নগরগুলোর জনসংখ্যার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By

(Problems & Remedies of Over Population of Urban Areas in Bangladesh)

বাংলাদেশের নগরগুলো মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যা এই সমস্ত নগরগুলোতে আগমনের ফলে যে সমস্ত সমস্যা হয় তা নিম্নরূপ:

ক. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা নগরে গমন করার ফলে যত্রতত্র আবাস গড়ে উঠছে। এতে অনেক কৃষি জমি বিনষ্ট হচ্ছে। ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
খ. শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা: অতিরিক্ত জনসংখ্যার তুলনায় ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় সবাই ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে না। প্রচন্ড চাপের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো সেবা দিতে না পারায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারছে না।
গ. চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমস্যা: শহরে চিকিৎসা কেন্দ্রসমূহ জনসংখ্যার চাপে ভালো সেবা দিতে পারছে না। সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন পেরিয়ে চিকিৎসকের দেখা পাওয়া কষ্টকর। আবার বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ঘ. যাতায়াত ব্যবস্থা ভঙ্গুর: আমাদের দেশের নগরগুলোতে রাস্তাঘাটের পরিমাণ আনুপাতিক হারে অনেক কম। কোনো শহরের মোট আয়তনের ২৫% রাস্তাঘাট ও উন্মুক্ত জায়গা হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে তা মাত্র ৭%-৮% এর বেশি ব্যবহার করা যায় না। ফলে অল্প জায়গা দিয়ে অধিক মানুষ ও যানবাহন যাতায়াতের ফলে রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে অল্প জায়গা পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে নাগরিকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা অপচয় হয়। পাশাপাশি শ্রম ও অর্থের অপচয় হয়।
ঙ. চিত্ত বিনোদনের অভাব: বেঁচে থাকার জন্য মানুষের চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নগরগুলোতে যে সমস্ত পার্ক, সিনেমা হল, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা আছে, তা তাদের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অধিক মানুষে ভরে যায়। ফলে কারোর পক্ষেই আর ভালোমতো বিনোদিত হওয়া হয় না।

নগরে অতিরিক্ত জনসংখ্যা আগমনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে নিম্নের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে-
১. গ্রামে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি: দেশের সর্বত্র কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। শিল্প কারখানা, অফিস আদালত প্রভৃতি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামেও স্থাপন করতে হবে। এতে কাজের প্রয়োজনে মানুষ শহরমুখী হবে না।
২. শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার বিস্তরণ: শহরের ন্যায় গ্রামেও পর্যাপ্ত ও ভালোমানের শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
৩. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: সরকারি, আধা সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি অফিসসমূহ গ্রাম পর্যায়ে কমপক্ষে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। ফলে ঘরের কাছে প্রয়োজন মিটলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না।
৪. পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন: নগরসমূহের ওপর চাপ কমাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্ক, শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, সিনেমা হল প্রভৃতি স্থাপন করতে হবে।
৫. জীবনযাত্রার মানের সমতা বিধান: নগর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানে বর্তমানে ব্যাপক বৈষম্য আছে। শহরের মতো গ্রামেও পাকা রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। জীবনযাত্রার মান একই রকম হলে বা কাছাকাছি হলেও গ্রাম থেকে মানুষ শহরে গমন করে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হবে না।

ভৌগোলিক পরিবেশ ও বসতির ভিন্নতাকোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সেই স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের উপাদানসমূহ অনুকূলে থাকতে হবে। বসতি স্থাপনে প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, সূর্যালোক, পানির সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষ নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নতুন পরিবেশ তৈরি করে। যেমন- যে সমস্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ পাওয়া যায় সেই সমস্ত জায়গায় অধিক জনবসতি গড়ে ওঠে। সাধারণত স্থিতিকাল, অবস্থান, আকৃতি, বিন্যাস, পেশা ও জনসংখ্যার আকার অনুসারে মানব বসতিকে শ্রেণিবিভাগ করা যায়।
গ্রামীণ বসতিবাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। গ্রামীণ বসতির অধিবাসীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ শিকার, প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত থাকে। গ্রামীণ ঘরবাড়ির নির্মাণ উপকরণ প্রধানত মাটি, টিন, খড়, ইট, ছন, গোলপাতা, বাঁশ প্রভৃতি। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ও চর অঞ্চলে পল্লী বসতি দেখা যায়। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা নিবিড় বা পুঞ্জীভূত বসতি গড়ে তোলে। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত, সারিবদ্ধ ও গোলাকার ধরনের বসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়।
বিক্ষিপ্ত বসতিযে বসতিতে একটি পরিবার অন্যটি থেকে অনেক দূরে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে তাকে বিক্ষিপ্ত বসতি বলে। যেমন- বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের বসতি।
পুঞ্জিভূত বসতিযে অধিবাসীদের বসতবাড়িগুলো খুব কাছাকাছি এবং ঘন বা নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠে তাকে পুঞ্জিভূত বসতি বলে। যেমন-ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বসিত। এ বসতিটি কোন বিশেষ সুবিধার (যেমন- চাকুরি, পানীয় জল) ওপর ভিত্তি কড়ে গড়ে ওঠে। এ ধরনের বসতিতে ২০০-৪০০টি পরিবার একত্রে বসবাস করে থাকে।
নগর বসতিযেসব বসতির বেশির ভাগ লোক দ্বিতীয় (যেমন- পোশাক, প্লাষ্টিক, জুতার কারখানা ইত্যাদি) ও তৃতীয় (যেমন- চিকিৎসা, চাকুরি, ব্যবসায়, শিক্ষা ইত্যাদি) পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত তাকে নগর বসতি বলে।
গ্রামীণ হাট বাজারগ্রামীণ জীবনযাত্রায় হাট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষের পক্ষে সব ধরনের উপকরণ উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই প্রাচীনকাল থেকে মানুষ নিজের উদ্বৃত্ত পণ্য অন্যের সাথে বিনিময় করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে আসছে। এই বিনিময় প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে গ্রামীণ হাট বাজার। গ্রামীণ হাট এক বা দুইদিন বসে। গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য প্রাত্যহিক বাজারে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে। গ্রামীণ হাটের মাধ্যমেই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য শহর অঞ্চলসহ সমগ্র দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়। গ্রামীণ মানুষের অর্থনীতির চাকা আবর্তিত হয় গ্রামীণ হাটকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশের নগরায়ণবাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হারে নগরায়ণ হচ্ছে। মানুষ কৃষি পেশা ত্যাগ করে অকৃষি পেশা গ্রহণ করছে। ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। শহরে সুযোগ সুবিধা বেশি হওয়ার কারণে গ্রামের মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ এর মতো ছোট বড় শহর আছে। বাংলাদেশের সকল পৌরসভাকে শহর হিসেবে ধরা হয়। শহর অপেক্ষা নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বেশি। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী প্রভৃতি বিভাগীয় শহর মহানগর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একটি মেগাসিটি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ উভয় নগর সম্প্রসারিত হয়ে নগরপুঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণঅপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষ ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে যত্রতত্র নগর গড়ে ওঠে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায় না। এর ফলে নগরে বস্তি গড়ে ওঠে এবং সকলের সমান নাগরিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...