(Causes of Migration)
বিভিন্ন কারণে মানুষ অভিগমন করে থাকে। অভিগমনের দুটি প্রধান কারণ হলো- আকর্ষণমূলক (Pull factors) এবং বিকর্ষণমূলক (Push factors)। আকর্ষণমূলক কারণে মানুষ নিজ ইচ্ছায় বাসস্থান ত্যাগ করলেও বিকর্ষণজনিত কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে। আকর্ষণ ও বিকর্ষণমূলক কারণগুলো হলো-
অভিগমনের আকর্ষণমূলক কারণ: উর্বর কৃষিজমি, খনিজ ও শক্তি সম্পদের ভাণ্ডার, অনুকূল ও আরামদায়ক জলবায়ু, উচ্চতর শিক্ষা, উন্নততর অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, জীবনযাত্রার উচ্চ মান, অজানাকে জানা, পানির প্রাচুর্য প্রভৃতি।
অভিগমনের বিকর্ষণমূলক কারণ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, মহামারি, অগ্নুৎপাত, ভূমিকম্প, দারিদ্র্যতা, সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক দাঙ্গা, যুদ্ধ, বেকারত্ব।
অভিগমন এর সার্বিক কারণগুলোকে দুইভাবে আলোচনা করা যায়। যথা: (ক) অভ্যন্তরীণ অভিগমন ও (খ) আন্তর্জাতিক অভিগমন।
ক. অভ্যন্তরীণ অভিগমনের কারণ: মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে একই দেশের ভেতর গ্রাম থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে এবং শহর থেকে শহরে অভিগমন করে থাকে। যেসব কারণে এ সকল অভ্যন্তরীণ অভিগমন হয়ে থাকে সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক কারণ মানুষ তার আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন করে। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অর্থনৈতিক কারণের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ভূমি ও খাদ্য সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি। যেমন- বাংলাদেশে গ্রাম থেকে মানুষ জেলা শহরে (ঢাকা, চট্টগ্রাম) চলে আসে।
২. সামাজিক কারণ: অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অন্যতম একটি কারণ হলো সামাজিক অবস্থা। যেমন: বিবাহজনিত কারণে মহিলারা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন করে থাকে। এছাড়া সন্তান জন্মদানের সময়েও মহিলারা পিত্রালয়ে অভিগমন করে যা অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী অভিগমন।
৩. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন কখনো কখনো জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ অভিগমন ঘটে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য মানুষ অনুন্নত গ্রাম হতে উন্নত শহরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। যেমন- বাংলাদেশের পৌরঅঞ্চলে (ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর) ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. শিল্পের উন্নয়ন: শহরে শিল্পের উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ অভিগমন ঘটে। শিল্পের উন্নতি অভিগমনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উপাদান। শহর এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং কৃষিভিত্তিক নয় এমন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানের মধ্যে অর্থনৈতিক অসমতা দেখা দেয়। এজন্য মানুষ স্থানান্তরিত হয়। যেমন- গাজীপুর।
৫. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও অভিগমনের একটি অন্যতম কারণ।
প্রাচীনকালে পরিবহনের সুযোগ সুবিধা না থাকায় অভিগমনের হার কম ছিল। বর্তমানে যোগাযোগ সহজ হওয়ার কারণে অভিগমনের হারও বেশি।
.৬. ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণ: দেশের অভ্যন্তরে এক শহর থেকে অন্য শহরে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে অভিগমন করে। যেমন: নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে রাজধানী ঢাকায় অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অভিগমন করে থাকে।
৭. ভূমি ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা: ভূমি ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা অভ্যন্তরীণ অভিগমনের আরেকটি কারণ। ভূমির
সীমাবদ্ধতা মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে জমির অনুপাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মাথাপিছু আয় কমে যায়। ফলে মানুষ অভিগমন করতে চায়। সাধারণত এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অভিগমণ ঘটে। যেমন- দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকা শহরে অভিগমন।
৮. জনসংখ্যার চাপ: পারিবারিক জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পেলে মানুষ এক স্থান হতে অন্য স্থানে অভিগমন করে। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অন্যতম একটি কারণ হলো জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি।
৯. কৃষিব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ: যে অঞ্চলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় সে অঞ্চলে কৃষকরা সহজেই অভিগমন করে। গ্রাম থেকে গ্রামে বা শহরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ অভিগমন দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক অভিগমনের কারণ মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যে অভিগমন করে তাকে আন্তর্জাতিক অভিগমন বলে। আন্তর্জাতিক অভিগমন যেসব কারণে হয় সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক কারণ: সাধারণত মানুষ উন্নত ও সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অধিক হারে অভিগমন করে। সাধারণত কৃষি জমির হ্রাস, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার এসব কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অভিগমন ঘটে থাকে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের মানুষ বিদেশে ভালো কাজের আশায় মধ্যপ্রাচ্যে (কাতার, বাহরাইন) অভিগমন করে থাকে।
২. সামাজিক কারণ: অভিগমনের জন্য কিছু সামাজিক কারণও থাকতে পারে, যেমন: আত্মীয়-স্বজন, ভাষা, বৈবাহিক সম্পর্ক, জোরপূর্বক উৎখাত, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। যেমন- রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা ইত্যাদি কারণে আন্তর্জাতিক অভিগমন ঘটে।'
৩. রাজনৈতিক কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিক অভিগমন হয়ে থাকে। সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা, আইন-কানুন, রাজনৈতিক অসন্তোষ ইত্যাদি কারণে অভিগমন হয়ে থাকে। যেমন- বাংলাদেশ থেকে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
৪. সাংস্কৃতিক কারণ: অনেক ক্ষেত্রে অভিগমনের পেছনে কিছু সাংস্কৃতিক কারণ থাকে। মানুষ উন্নত ও মুক্ত সমাজব্যবস্থার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়। শিক্ষা, খাদ্যাভাব, ভাষা, উন্নত মন-মানসিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন দেশে অভিগমন করে থাকে। যেমন- বাংলাদেশের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে l
৫. ধর্মীয় কারণ: ধর্মীয় কারণেও কিছু মানুষ অভিগমন করে থাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের মধ্যে হিন্দু অধ্যুষিত দেশে ও মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষদের মধ্যে মুসলমান অধ্যুষিত দেশে অভিগমনের প্রবণতা থাকে। যেমন: সামর্থ্যবান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই বাংলাদেশ থেকে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন।
৬. শিক্ষা ও গবেষণা: উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার কাজেও অভিগমন হয়ে থাকে। মানুষ অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশসমূহ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য উন্নত দেশগুলোতে অভিগমন করে। যেমন- বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য যুক্তরাজ্য, কানাডায় গমন করে।
৭. জলবায়ু পরিবর্তন: বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সেই সাথে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধিও অভিগমনের কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more