(Equatorial Climatic Region)
অবস্থান: নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে থেকে অক্ষাংশের মধ্যে যে জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়, তাকে নিরক্ষীয় জলবায়ু বলে। তবে কোনো কোনো স্থানে অক্ষাংশ পর্যন্ত এ জলবায়ু দেখা যায়। আমাজান অববাহিকা (দক্ষিণ আমেরিকা), আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকা, এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নিউগিনি, দক্ষিণ ফিলিপাইন প্রভৃতি অঞ্চল নিরক্ষীয় জলবায়ুর অন্তর্ভূক্ত।

নিরক্ষীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যসমূহ: নিরক্ষীয় অঞ্চলের জলবায়ু প্রধানত নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয় বলে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য প্রায় একই থাকে। জানুয়ারি ও জুলাই মাসের তাপমাত্রার পার্থক্য নেই বললেই চলে। তাই ঋতু পরিবর্তন এ অঞ্চলে তেমন দেখা যায় না। সারাবছর অধিক তাপ ও বৃষ্টিপাত এ জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বায়ুর তাপ : নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেয়। দিবাভাগের দৈর্ঘ্য সারা বছর প্রায় সমান থাকে বলে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা সারা বছরই অধিক থাকে এবং বিভিন্ন মাসের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কম। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা সাধারণত সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এ অঞ্চলের তাপের দুইটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যথা- (১) সারাবছর সমানভাবে অধিক তাপ; এবং (২) সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপের পার্থক্য কম। পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে (সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন) নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা অনুভূত হয়। কিন্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো সারা বছর অধিক তাপ এবং তাপমাত্রার পার্থক্য এতো কম আর কোথাও দেখা যায় না।
বায়ুরচাপ ও বায়ুপ্রবাহ নিরক্ষীয় অঞ্চলে আনুভূমিকভাবে তাপমাত্রার পরিবর্তনের হার খুব কম বলে বায়ুচাপের
পরিবর্তনের হারও কম। ফলে আনুভূমিকভাবে বায়ুপ্রবাহের বেগও অনেক কম। কেবল প্রান্তভাগে অয়ন বায়ুর প্রবেশজনিত কারণে আনুভূমিক বায়ুপ্রবাহের বেগ অপেক্ষাকৃত অধিক হয় এবং নিরক্ষীয় শান্তবলয়ের দিকে বায়ুর বেগ ক্রমশ কমে যায়। অত্যধিক তাপের জন্য বায়ুতে সর্বদা পরিচলন প্রক্রিয়া (Convectional Process) চলতে থাকে এবং স্থায়ীভাবে নিম্নচাপ বিরাজ করে। ফলে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু এখানে এসে ঊর্ধ্বগামী হয়। এ ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত ওপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের জন্য নিরক্ষীয় শান্তবলয় যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণে কিছুটা সরে যায় বলে এ জলবায়ু অঞ্চলের কোনো কোনো স্থানে শুষ্ক অয়ন বায়ু (কঙ্গো) প্রবেশ করে। এখানকার আবহাওয়া কিছুটা আরামদায়ক।
বৃষ্টিপাত : নিরক্ষীয় অঞ্চলে জলভাগ অধিক হওয়ায় সারাদিনই সূর্যের তাপে পানি বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে উঠতে থাকে। এ বায়ু পরিচলন প্রক্রিয়ায় ঊর্ধ্বে প্রসারিত ও শীতল হয়ে অপরাহ্নে (বিকেলে) ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ থেকে ২৫০ সেন্টিমিটার। এখানে প্রতিদিনই বৃষ্টিপাত হয়। স্থান বিশেষে (ক্যামেরুনের পর্বত পাদদেশীয় অঞ্চলে) ১০০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়।
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য-
উদ্ভিজ্জ: সারাবছর ধরে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং অধিক তাপের জন্য এ অঞ্চলে প্রশস্ত পত্রযুক্ত চিরহরিৎ বৃক্ষের গভীর বনের সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার গাছগুলো খুব উঁচু এবং ঘন হওয়ায় সূর্যের আলো নিচে পৌছায় না। ফলে বনের নিচের অংশে ঝোপঝাড় কম হয়। কোনো কোনো স্থানে (মালয়শিয়ার বনভূমি) এ সব বৃক্ষ ৪৯ মিটারের মতো উঁচু হয়ে থাকে। নিরক্ষীয় বনভূমির গাছগুলোর মধ্যে সেগুন, মেহগনি, আবলুস, রোজউড, রাবার, চন্দন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
মাটি: নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাটি সবসময় নরম ও ভিজা থাকে। তথাপি এ অঞ্চলের মাটি বিশেষ উর্বর নয়। তবে এ অঞ্চলে কোনো কোনো স্থানে লাল মৃত্তিকা, চুন জাতীয় এবং আগ্নেয় মৃত্তিকা দেখা যায়।
জীবজন্তু: এ অঞ্চলের বনে বৃক্ষচারী জীবজন্তুর সংখ্যাই বেশি। কারণ নিবিড় অরণ্যে কোনো পদচারী পশু চলাফেরা করতে পারে না। পাখি, গেছো সাপ, গরিলা, বানর প্রভৃতি বৃক্ষচারী প্রাণী বৃক্ষের শাখায় বিচরণ করে। হিংস্র মাংসাশী প্রাণী (যেমন- বাঘ, সিংহ, হায়েনা প্রভৃতি) এই অঞ্চলে দেখা যায় না।
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more