(Classification of Rural Settlement in Bangladesh)
সাধারণভাবে প্রাথমিক উপজীবিকার ওপর নির্ভরশীল কোনো জনগোষ্ঠীর বসতিকে গ্রামীণ বসতি বলা হয়। এ ধরনের বসতির অধিবাসীরা প্রধানত কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ শিকার, বৃক্ষ কর্তন প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত থাকে। বাংলাদেশে ৬৩% লোক গ্রামে বাস করে (UN Population Devision's World Urbarization Prospects: 2018 Revision)। নিচে বাংলাদেশের গ্রামীণ বসতির শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলো।
১.পল্লীবসতি: অতি ক্ষুদ্রাকার জনবসতিকে পল্লীবসতি বলে। প্রধানত ৩ হতে ৫টি বাড়ি নিয়ে এই বসতি গঠিত।
বৈশিষ্ট্য:
১. অধিবাসীদের জীবনযাত্রা খুবই নিম্নমানের।
২. বাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ অর্থাৎ মাটি বা চাটাই দ্বারা তৈরি।
অবস্থান: বাংলাদেশের পাহাড়িয়া ও চর অঞ্চলে এ শ্রেণির, বসতি দেখা যায়।

২. গ্রাম্য বসতি: অপেক্ষাকৃত বৃহৎ পল্লীবসতিকে গ্রাম্য বসতি বলে।
বৈশিষ্ট্য:
১. এতে অধিক সংখ্যক বাড়ি থাকে।
২. এ বসতির অধিকাংশ বাড়িঘর বাঁশ, ছন বা মাটির তৈরি।
৩. মাঝে মাঝে ইট বা টিনের তৈরি বাড়িও দেখা যায়।
৪. এটি পল্লীবসতির চেয়ে উন্নত।

অবস্থান: বাংলাদেশের নদী তীরবর্তী অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই এ শ্রেণির বসতি দেখা যায়। যেমন: শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী আগুয়ান্দী গ্রাম।
৩. বিক্ষিপ্ত বসতি: বিক্ষিপ্ত বসতি বলতে এমন একটি বসতিকে বোঝানো হয় যেখানে দুই বা তিনটি ঘরের অবস্থান থাকে যা এক বা দুইটি পরিবারের ৫/৭ জনের আবাসস্থল।
বৈশিষ্ট্য:
১. কৃষি জমির মাঝখানে এ ধরনের বসতি গড়ে ওঠে।
২. এ ধরনের বসতিতে দুই থেকে চারটি বাড়ি থাকতে পারে।
৩. পরিবারের আকার বাড়ার কারণে দেশে বিক্ষিপ্ত বসতির সংখ্যা বাড়ছে।

অবস্থান: বাংলাদেশের প্লাবন সমভূমির প্রায় সব জায়গায় বিক্ষিপ্ত বসতির প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী; পাবনা, নোয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের বসতি অধিক।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও ধলেশ্বরী প্লাবন ভূমি এবং সিলেটের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে এ বসতি দেখা যায়।
৪. নিবিড় বসতি (পুঞ্জিভূত বসতি): কোনো বিশেষ সুবিধার জন্য যখন কোনো স্থানে অনেকগুলো বাড়ি একত্রে অবস্থান করে তখন তাকে নিবিড় বসতি বলে।
বৈশিষ্ট্য:
১. উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থা দেখা যায়।
২. বসতিগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে।
৩. শিক্ষার হার ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো।
৪. এ ধরনের বসতিতে সমবায় কৃষি পদ্ধতি দেখা যায়।
৫. ২০০-৪০০ পরিবার একসাথে বাস করে।
অবস্থান: সিলেটের পাহাড়িয়া অঞ্চল। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা শান্তি বাহিনীর ভয়ে এ ধরনের বসতি গড়ে তুলেছিল যা এখনও টিকে রয়েছে। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর এবং মধুপুরে এ ধরনের বসতি দেখা যায়।,
৫. সারিবদ্ধ বসতি: যে বসতিগুলো পাশাপাশি অবস্থিত হয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন সারি (Line) সৃষ্টি করে তাকে সারিবদ্ধ বসতি বলে। এ ধরনের বসতি কখনও কখনও ৫/৬ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। একে রৈখিক বসতিও বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:
১. এ ধরনের বসতি দীর্ঘ সময় নিয়ে গড়ে ওঠে।
২. সেবা সুবিধা (বাজার, শিক্ষা) সুবিধাজনকভাবে গড়ে তোলা যায় না।
৩. অধিবাসীদের সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তোলা কঠিন হয়।
অবস্থান: বাংলাদেশের ছোট বড় সব নদীর তীরে এবং রেললাইন ও রাস্তার পাশে প্রধানত এ বসতি দেখা যায়। মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ অঞ্চলে সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীসমূহ খুব একটা সক্রিয় নয়। তাই নদীর দুই পাড়েই সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়। সিলেটের চা বাগান অঞ্চলে ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে সারিবদ্ধ বসতি দেখা যায়।
৬. গোলাকার বসতি শুষ্ক অঞ্চলের কোনো ঝরণা বা হ্রদ বা অন্য কোনো আকর্ষণীয় স্থানের চারপাশে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে গোলাকার বসতি বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:
১. বিল ও ডোবা এলাকায় গোলাকার বসতির প্রাধান্য বেশি।
২. ধর্মীয় উপাসনালয়কে ঘিরে অনেক সময় এ ধরনের বসতি গড়ে ওঠে।
অবস্থান: বাংলাদেশের দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার ডাকাতিয়া বিল ও রাজশাহীর চলন বিলে এ ধরনের বসতি দেখা যায়।
শিল্পের অনগ্রসরতা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বাংলাদেশে গ্রামীণ বসতি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এছাড়া ব-দ্বীপ গঠিত প্লাবন সমভূমি, পাহাড় ও উচ্চভূমির অবস্থান, নদ-নদীর আধিক্য ও হাওড়-বাওড় ইত্যাদির উপস্থিতি এদেশের গ্রামীণ বসতির গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই
Read more