hsc

বাংলাদেশের বায়োম (পাঠ-৯)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1

(Biome of Bangladesh)

বাংলাদেশে সাধারণত স্থলজ বায়োম দেখা যায়। বৃষ্টিবহুল এলাকা হওয়ায় প্রধান জীবগোষ্ঠী হলো বৃক্ষ এবং অন্যান্য কাষ্ঠল উদ্ভিজ্জ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ একই রকম বাৎসরিক তাপমাত্রাযুক্ত (৩০°C) আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয়। উত্তর অংশে তাপমাত্রার উঠানামা লক্ষণীয়। এখানে শরৎ ও শীতকালের তাপমাত্রা °-°C এর মধ্যে থাকে, বসন্তে বেড়ে পশ্চিম ও পূর্বাংশে গ্রীষ্মে ৩০°C ছাড়িয়ে যায়। শীতকাল শুষ্ক কিন্তু গ্রীষ্ম আর্দ্র। দক্ষিণ অংশে গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু থাকলেও তা সুস্পষ্ট বিভেদিত নয়। পার্বত্য এলাকায় আবহাওয়া সিক্ত ধরনের।

পরিবেশ: এ অঞ্চলের ভূমিরূপ বা ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, নদী-নালা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদি অজীব পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি। এ অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রকৃতি এবং এই প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে অবস্থানরত উদ্ভিদকুল এবং প্রাণীকুলকে নিয়ে গড়ে ওঠে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার তাপমাত্রা গড়ে ২০-২৫° সেলসিয়াস। এখানকার বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫০-৪৫০ সে.মি., তবে বর্ষাকালে অপেক্ষাকৃত বেশি। সে কারণে এ ঋতুতে মাটি ভেজা ও স্যাঁতসেতে থাকে।
পলি দিয়ে এ অঞ্চলের মাটি গঠিত, কাজেই মাটি বেশ উর্বর। বর্ষার সময় এ অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা বর্ষার পানিতে প্লাবিত হয়, ফলে প্রচুর জলজ উদ্ভিদের জন্ম ও বিস্তার ঘটে। বর্ষার শেষে অনেক জলজ উদ্ভিদ পচে জৈব সারে পরিণত হয় এবং মাটিকে উর্বর করে। হাওর, বাঁওড় ও বিল অঞ্চলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানি থাকে। তবে শীতকালে পানি কমে যায় এবং বিস্তৃত এলাকায় সাধারণত ধান চাষ হয়।

এখানকার উচ্চভূমির মাটি অনুর্বর, অম্লীয় এবং লাল, কোথাও কোথাও ধূসর (সোপানভূমিতে) বর্ণের। বৃষ্টিপাত অপর্যাপ্ত, বছরে ২০০০ মি.মি. এর কম। আবহাওয়া কিছুটা চরমভাবাপন্ন। গ্রীষ্মের উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্ক শীতকাল, বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ কম ইত্যাদি এখানকার পরিবেশীয় বৈশিষ্ট্য।

খাড়ি অঞ্চল জুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এ অঞ্চলের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এ অঞ্চলে অবস্থিত। এ এলাকার মাটি লবণাক্ত, কর্দমাক্ত ও জলাবদ্ধ। এছাড়া প্রাত্যহিক জোয়ার-ভাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশীয় নিয়ামক। এগুলোর প্রত্যেকটি সাধারণত গাছপালার জন্য প্রতিকূল। প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য এখানকার গাছগুলোর কিছু অভিযোজনিক বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন- শ্বাসমূল।

উদ্ভিদ: বিভিন্ন ধরনের উচ্চ বৃক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ এদেশের বনভূমিতে জন্মে এবং একক কোন প্রজাতি আধিপত্য বিস্তার করে না। বনে প্রজাতিবৈচিত্র্য বেশি। অধিকাংশই চিরসবুজ তবে বিচ্ছিন্ন কিছু পর্ণমোচী বৃক্ষ জন্মে। বৃক্ষগুলো ২-৩ স্তরে চাঁদোয়া (Canopy) গঠন করে। বৃক্ষের সাথে অনেক কাষ্ঠল লতা এবং পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ জন্মে। এছাড়া ফার্ণ, মস ও তাল জাতীয় গাছ জন্মে।

এছাড়া গ্রীষ্মমণ্ডলের অরণ্যের গাছগুলো লম্বা চওড়া পাতাবিশিষ্ট চিরসবুজ। বিভিন্ন উচ্চতার গাছ নিয়ে এটি কয়েক স্তরীয় বনভূমির সৃষ্টি করে। এসব বনে সব গাছ সমান উঁচু হয় না। সর্বোচ্চ গাছগুলো ৬০ মিটার (২০০ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়। যেমন- গর্জন, চাপালিশ, সিভিট, তেলেগু। মাঝারি উচ্চতার গাছগুলো হলো চিকরাশি, গামার। সবচেয়ে ছোট আকারের গাছের মধ্যে জারুল ও উড়ি আম উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও পাহাড়ি অঞ্চলের বনভূমিতে চিরসবুজ, মিশ্র সবুজ, পাতা ঝরা, বেত ও বাঁশ বন দেখা যায়। এখানে সিভিট, গর্জন, চন্দুল, নাগেশ্বর, বাটনা, টালি, পিত্তরাজ, পুনাইল, কড়ই, গামার, ভাদি, বান্দরহোলা, উদল, আমড়া, শিলভাদি ইত্যাদি বৃক্ষ দেখা যায়। এর মধ্যে গামার, কড়ই, ভাদি, শিলভাদি, উদল, আমড়া পাতাঝরা বৃক্ষ। এ অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ ও ছন বন দেখা যায়। শাল, পলাশ, কড়ই, চাপালিশ প্রভৃতি এ বনের প্রধান গাছ।

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রধান উদ্ভিদ হলো বাইন, ওরা, কেওড়া, সইলাকাঁটা, গরান, কাঁকড়া, হিন্তাল, গোলপাতা, হারগোজা, খলশি, হোদা (টাইগার ফার্ন), নোনালতা, সুন্দ্রীলতা এবং অতি অল্প পরিমাণে সুন্দরী গাছ পাওয়া যায়।
নিম্নাঞ্চলের জলজ উদ্ভিদের মধ্যে শাপলা, পদ্ম, কলমি, হেলেঞ্চা, শোলা, পাতা শেওলা, ঝাঁঝি, শ্যামাকলা, ক্ষুদিপানা, কুচিপানা, কচুরিপানা, টোপাপানা, গুড়িপানা, পানিফল, পানি মরিচ ও বিভিন্ন জাতের ঘাস প্রধান।
অনাবাদি জমিতে জন্মানো উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে কলকাসুন্দা, শ্বেতদ্রোন, রক্তদ্রোন, কাঁটানটে, নটেশাক, কাকমাছি, কান্তিকরি, ধুতুরা, হাতি শুড়, শিয়ালমতি, তারালতা, ভাট, মুক্তাঝুরি, কচু, খাগড়া ইত্যাদি প্রধান। আবার বাড়ির আশপাশে সুপারি, নারিকেল, আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, তেঁতুল, কুল, জাম, বাঁশ, বড়ই, পিপুল, আকন্দ ইত্যাদি বৃক্ষ প্রজাতির বিস্তার দেখা যায়।

প্রাণী: এ অঞ্চল প্রাণিবৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। এখানে বহু প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় প্রাণী বাস করে। এর মধ্যে বানর, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, শামুক, জোঁক, বিছা, মথ, পিঁপড়া, উঁইপোকা, কুনোব্যাঙ, সোনাব্যাঙ, টিকটিকি, গিরগিটি, কাছিম, গুঁইসাপ, তক্ষক, গোখরা সাপ, দাঁড়াশ সাপ, বেজি, চড়ুই, শালিক, টিয়া, কাক, চিল, শকুন, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া এ অঞ্চলের নদীতে শুশুক এবং অগভীর জলাভূমিতে টাকি, মেনি, বাইম বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়াও কাছিম, সারস, বক, কাঁদাখোচা পাখি, ঈগল, পানকৌড়ি, বক ইত্যাদি প্রাণী পাওয়া যায়। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী বাস করে। এখানে প্রচুর লাল কাঁকড়া, চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়। সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য প্রাণী হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের বনাঞ্চলে এখন মাত্র শ'দুয়েক বাঘ আছে। এছাড়া এ বনে ভোদর, বনবিড়াল, শূকর ও চিত্রা হরিণ আছে। এ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীতে রয়েছে বিরাটাকায় কুমির।

এছাড়াও বিভিন্ন প্রাণিকুলের মধ্যে কাঠবিড়ালি, শিয়াল, খাটাশ, হনুমান, বাগডাস, কাঠ ঠোকরা, পেঁচা, চিল, নেউল, গুঁইসাপ, বৃহদাকার নির্বিষ অজগর, বিষাক্ত গোখরা সাপ, বড় ইঁদুর, উল্লুক, ভাল্লুক, হাতি, বনগরু ইত্যাদি প্রধান। এখানে এককালে প্রচুর চিতাবাঘ ও হরিণ ছিল, এখন নেই বললেই চলে।

জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...