(Sources of Air Pollution)
বর্তমানে বায়ু দূষণকে মানবসৃষ্ট (Man made) বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বৃহৎ নগরভাবে অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় এ দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পেট্রোল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের জন্য বায়ু দূষণ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বায়ু দূষণের প্রধান দুটি উৎস হচ্ছে যানবাহনের ধোঁয়া এবং কলকারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়া।
মানুষের কার্যকলাপ (শিল্পোৎপাদন) এবং ধুলাবালিযুক্ত বায়ু এই উভয় কারণে বায়ুর গুণগত মান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বায়ু দূষণের উৎসগুলো হচ্ছে: (ক) নগরায়ণ, (খ) শিল্পাঞ্চলের দূষণ, (গ) যানবাহনের ধোঁয়া, (ঘ) ইটভাটা, (ঙ) বহুতল ভবন নির্মাণ, (চ) খোলা স্থানে আবর্জনা নিক্ষেপ, (ছ) গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো, (জ) তেজস্ক্রিয় বস্তু, (ঝ) কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার ইত্যাদি।
ক. নগরায়ণ: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে নগরায়ণ। নগর বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮১ সালে নগর জনসংখ্যা ছিল ১৪.০৮ মিলিয়ন, যা ১৯৯১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৫ মিলিয়নে। ২০১৯ এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২.৫৭ মিলিয়নে যা মোট জনসংখ্যার ৩৭.২%। বাংলাদেশের বৃহৎ নগর কেন্দ্র যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ইত্যাদি শহরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। এর সাথে মোটরযানের সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ধোঁয়া, অধিক ধুলাবালি বায়ুকে দূষিত করছে। বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা, রেলওয়ে ইঞ্জিন, পাওয়ার প্লান্ট, খোলা স্থানে আবর্জনা পোড়ানো, ধুলাবালি ইত্যাদি কারণে এসব নগরে বায়ু দূষিত হচ্ছে।
খ. শিল্পাঞ্চলের দূষণ : শিল্পকারখানা অধিক গড়ে ওঠার কারণে বায়ু দূষিত হয়। কারণ শিল্প কারখানাগুলো জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসাবে যে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, গ্যাস) ব্যবহার করে তা বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এ কারখানাগুলো সাধারণত বড় বড় শহরে (যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলে) গড়ে উঠেছে। তাই এসব শহরে বায়ু দূষণের মাত্রাও বেশি। বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা ৪ বছরের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ১১%।

টেক্সটাইল এবং ডায়িং, ট্যানারি ও কাগজ শিল্প, সিমেন্ট, মেটাল সার এবং রাসায়নিক কারখানা বিশেষ করে সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড ও অ্যামোনিয়া ইত্যাদি বায়ু দূষণের জন্য দায়ী।
গ. যানবাহনের ধোঁয়া: দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের অধিকাংশ মানুষ কার, বাস, অটোরিক্সা, মোটরসাইকেলে যাতায়াত করে, যা বায়ু দূষণের কারণ। এগুলোর ধোঁয়া বায়ুর গুণগত মানকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। BBS এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন যানবাহন যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এগুলোর ধোঁয়া শহরকে দূষিত করে মানুষের জীবন বিপন্ন করছে।পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি কিউবিক মিটারে ৪৬৩ মাইক্রোগ্রাম বায়ুবাহিত পার্টিকেল ঢাকার বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হচ্ছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। মহাখালী বক্ষব্যধি ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭ মিলিয়ন লোক ব্রংকাইটিস জাতীয় রোগে ভুগছে, যা মূলত যানবাহনের দূষণ থেকে হয়।
ঘ. ইটভাটা : ইটভাটায় যে কয়লা ও কাঠ পোড়ানো হয় তা প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, যা বায়ুর সাথে মিশে বায়ু দূষণ ঘটায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানে ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণে কাঠ এবং নিম্নমানের কয়লা ব্যবহৃত হয়। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ কালো ধোয়া উৎপন্ন হয় এবং বায়ু দূষণ ঘটে থাকে। নতুন চিমনিগুলোতে যেসব জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তা থেকেই শুধু যে বায়ু দূষণ ঘটে তা নয়, পুরোনো চিমনি ও ইটভাটায় নিষ্ফল তাপীয় অবস্থার জন্যও বায়ু দূষণ ঘটে। সালফার অক্সাইড, কার্বন উপাদান, বিভিন্ন জৈব উপাদান বায়ুর গুণকে ধ্বংস করে। বর্তমানে বড় বড় শহরগুলোর চারপাশে পুঞ্জীভূতভাবে (agglomerated) ইটভাটা গড়ে উঠছে, যা শহরগুলোর বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। যেমন : সাভারের আমিনবাজারে ইটভাটার কারণে সাভার এলাকাসহ রাজধানী ঢাকা বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে।
ঙ. বহুতল ভবন নির্মাণ: বহুতলভবন নির্মানের সময় শহর এলাকায় যে পরিমাণ ধুলা বাতাসে ওড়ে তাতে শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট হয়। উপরন্তু নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কালো ধোঁয়া বাতাসে নির্গমনের অন্যতম উৎস। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে নির্মিত ইটের বাড়িঘরও এরূপ বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছে।
চ. খোলা অবস্থানে আবর্জনা নিক্ষেপ: শহর এলাকায় যত্রতত্র আবর্জনা নিক্ষেপ করার ফলে দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এছাড়া এসব আবর্জনা পচে মিথেন গ্যাসের সৃষ্টি হয় যা বায়ু দূষণ ঘটায়। বিশেষ করে বদ্ধ জলাশয় বায়ু দূষনের অন্যতম উৎস।
ছ. গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি (লাকড়ি) হিসেবে কাঠের (গাছের ডাল) ব্যবহার ব্যাপক। এসব জবলানির অপূর্ণ দহনে প্রচুর পরিমাণ নির্গত হয় এবং বায়ু দূষণ ঘটায়। এছাড়া বনাঞ্চলে কৃষিভূমি তৈরি করার জন্য বনের গাছপালা পোড়ানো হয়। এতে করেও বায়ু দূষণ ঘটে।
জ. তেজস্ক্রিয় বস্তু: তেজস্ক্রিয় বস্তু বাতাসে ভেসে বেড়ালে তা মারাত্মক দূয়ষণ ঘটায় এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র (যেমন- পারমাণবিক বিদ্যুৎ) এরূপ বায়ুদূষণের উৎস।
ঝ. কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার: অধিক ফসল পাওয়ার আশায় কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপকহারে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কীটনাশক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্প্রে করে ছিটানো হয়। ফলে সরাসরি বায়ুর দূষণ ঘটে
বায়ুমণ্ডল ও বায়ু দূষণ খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more