(Mediterranean Climatic Region)
অবস্থান: ভূমধ্যসাগর এবং এর তীরবর্তী দেশসমূহে এ জলবায়ুর বিস্তৃতি ও প্রভাব সর্বাধিক বলে এ জলবায়ুকে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু বলে। মহাদেশগুলোর পশ্চিমাংশে থেকে ৪৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দেখতে পাওয়া যায়। এশিয়ার পশ্চিমে লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, দক্ষিণ তুরস্ক, উত্তর আফ্রিকার মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো; ইউরোপের গ্রিস, বসনিয়া, দক্ষিণ ইতালি, মাল্টা, সিসিলি, দক্ষিণ স্পেন; উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, মধ্য চিলি এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে এই জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।

ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে সারা বছর রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে। শীত-গ্রীষ্ম ও দিন-রাত্রির তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য, মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ, বৃষ্টিবহুল শীতকাল এবং বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকাল প্রভৃতি ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এটি একটি আরামদায়ক জলবায়ু অঞ্চল।
বায়ুর তাপ: এ জলবায়ু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা সেলসিয়াসের মধ্যে এবং শীতকালীন তাপমাত্রা সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। শীত-গ্রীষ্মের তাপমাত্রার পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ সেলসিয়াস।
ক. গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা: গ্রীষ্মকালে সূর্যের প্রায় উল্লম্ব অবস্থানের জন্য বায়ুর তাপমাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। এ ঋতুতে গড় তাপমাত্রা থেকে ২৭° সেলসিয়াস হলেও কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। গ্রীষ্মকালে আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় রাতে তাপ সহজেই বিকিরিত হয় এবং হ্রাস পায়। ফলে এ ঋতুতে দিনরাত্রির তাপমাত্রার ব্যবধান অনেক বেশি হয়। এমনকি ৪° সেলসিয়াস বা তারও অধিক হয়ে থাকে। সমুদ্র উপকূল হতে যতই দেশের অভ্যন্তরে যাওয়া যায় তাপমাত্রার এ ব্যবধান ততই বৃদ্ধি পায়। যেমন- মোগাডরে হলেও মরক্কোতে সেলসিয়াস, সানফ্রান্সিসকোতে কিন্তু স্যাক্রামেন্টোতে ২° সেলসিয়াস।
খ. শীতকালীন তাপমাত্রা: সূর্য যখন তির্যকভাবে কিরণ দেয় তখন শীতকাল। মৃদুভাবাপন্ন শীত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া শীতকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শীতকালীন গড় তাপমাত্রা থেকে ১০° সেলসিয়াস এর মতো হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা কিছু বেশি থাকে।
বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহ: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে শীতকালে আর্দ্র পশ্চিমা বা প্রত্যয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এ সময় বায়ুতে নিম্নচাপ বিরাজ করে। গ্রীষ্মকালে শুষ্ক অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। তাই এ সময় বৃষ্টিপাত হয় না। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সূর্যের উত্তরায়ণ হলে সূর্য কর্কটক্রান্তির নিকটবর্তী হয়। তখন পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলো উত্তর দিকে সরে যায়। চাপ বলয়ের সাথে সাথে বায়ু বলয়গুলোও উত্তরে সরে অবস্থান করে। ফলে এ সময় উত্তর গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের দেশগুলোর উপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে আসে বলে এতে জলীয়বাষ্প থাকে না। ফলে এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় না। এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল থাকায় এবং বায়ু চাপ বলয়গুলো কিছুদূর উত্তরে সরে যাওয়ায় সেখানকার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলোর উপর দিয়ে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু সমুদ্র হতে আসে বলে তাতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে এবং ঐ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
শীতকালে সূর্যের দক্ষিণায়ন হতে সূর্য যখন মকরক্রান্তি রেখার নিকটবর্তী হয় তখন পৃথিবীর চাপ বলয়গুলো দক্ষিণে সরে যায়। এর ফলে উত্তর গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর উপর দিয়ে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়। এ বায়ু সমুদ্র হতে আসে বলে প্রচুর জলীয়বাষ্প বহন করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ সময় দক্ষিণ গোলার্ধের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলো শুষ্ক অয়ন বায়ুর অধীনে থাকে এবং তথায় বৃষ্টিপাত হয় না।
বৃষ্টিপাত : ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে আর্দ্র পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহের জন্য শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়, গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এ অঞ্চলে বার্ষিক ২৫ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।
শীতকালে বৃষ্টিপাত হলেও আকাশ একেবারে মেঘাচ্ছন্ন থাকে না এবং বায়ু আর্দ্র হলেও স্যাঁতসেঁতে থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘূর্ণিবাত হতে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। অল্প কয়েক দিনে অধিকাংশ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে এবং বর্ষণ দিনগুলো দীর্ঘ শুষ্ককাল দ্বারা বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে বছরের অধিকাংশ দিন আকাশ মেঘমুক্ত থাকে এবং উজ্জ্বল সূর্যকিরণ পাওয়া যায়। এ জলবায়ু অঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চলে অত্যধিক তুষারপাত হয়। যেমন-ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা উচ্চভূমির (২৩৩৩-২৪৩৮ মিটার) পশ্চিম ঢালে বছরে গড়ে ১০০০ সেন্টিমিটারের অধিক তুষারপাত হয়ে থাকে।
ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য
কৃষি (Agriculture) : এ জলবায়ু অঞ্চলের মৃত্তিকা মোটামুটি পলিযুক্ত ও উর্বর। গম চাষের জন্য এ অঞ্চল বিশেষ
উপযুক্ত। অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে পানি সেচের সাহায্যে গম, যব, ভুট্টা, তুলা প্রভৃতি ফসলের চাষ হয়। এছাড়া প্রচুর সূর্যকিরণ ফল পাকার জন্য উপযোগী বলে এ অঞ্চলের জলবায়ু ফল উৎপাদনের অনুকূল। জলপাই ও ডুমুর জাতীয় গাছ এ জলবায়ুবিশিষ্ট দেশগুলোতে সর্বত্রই জন্মে। আঙুর ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশেষত ক্যালিফোর্নিয়া উপত্যকায় প্রচুর ফলের বাগান দেখা যায়। আপেল, কমলালেবু, আখরোট, পীচ, নাসপাতি, আঙ্গুর প্রভৃতি ফল প্রচুর পরিমাণে জন্মে।
উদ্ভিজ্জ (Vegetation): এ জলবায়ু অঞ্চলে সাধারণত আর্দ্র বৃষ্টিবহুল শীতকাল এবং বৃষ্টিহীন দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল বিরাজ
করে। শুষ্ক গ্রীষ্মকাল ও আর্দ্র শীতকাল হওয়ায় এরূপ জলবায়ুর উদ্ভিজ্জসমূহ শুষ্কতার মোকাবেলা করার ক্ষমতাসম্পন্ন। বৃষ্টিবহুল শীতকালে বৃক্ষাদি জন্মে। ছোট ছোট গাছ ও ঝোপঝাড় এ অঞ্চলে বেশি জন্মে। গ্রীষ্মকাল বৃষ্টিহীন ও শুষ্ক হওয়াতে এ ঋতুতে বৃক্ষলতাদির বৃদ্ধি খুব একটা হয় না। জলাপাই এ অঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ। এছাড়াও ওক, কর্ক, মিষ্টি বাদাম, সিডার, পাইন, তুতগাছ প্রভৃতি বৃক্ষও এ জলবায়ু অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।
জীবজন্তু (Animals): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বনভূমি ও তৃণভূমির পরিমাণ কম। ভেড়া, ছাগল, অশ্ব, উট, খচ্চর, গাধা, শুয়োর এ অঞ্চলের প্রধান জীবজন্তু। এ অঞ্চলে তৃণভূমি বা চারণক্ষেত্র কম থাকায় পশু খামার গড়ে উঠেনি। তবে বর্তমানে অনেক স্থানে গো-মহিষাদি প্রতিপালিত হয়।
খনিজ (Minerals): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। যেমন- ইতালিতে গন্ধক ও মর্মর পাথর এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনা ও খনিজ তেল পাওয়া যায়। উত্তর আফ্রিকা খনিজ তেলে সমৃদ্ধ।
শিল্প (Industry): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি সম্পদের বিশেষত কয়লার অভাব থাকায় সেখানে কোনো বৃহৎ যন্ত্রশিল্প
গড়ে ওঠেনি। কৃষিকার্যের ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ বাণিজ্য ও শিল্পে বিশেষ উন্নতি সাধন করেছে। মদ তৈরি, সাবান ও রেশম শিল্প এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শিল্প। সুবিধাজনক জলবায়ু থাকায় পৃথিবীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পকেন্দ্র 'হলিউড' ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস নামক স্থানে গড়ে উঠেছে। ইতালিও সিনেমা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বার্সেলোনা, নেপল্স, মিলান, চিড়িরিন এবং মার্সিলিস বয়ন ও কারিগরি শিল্পের কেন্দ্র।
পরিবহন (Transport): এ অঞ্চলের দেশগুলো বেশ সমৃদ্ধ বলে পরিবহন ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি সম্ভব হয়েছে। রেলপথ ও সড়কপথ এ অঞ্চলের দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান অবলম্বন। এছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিমান ও জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাণিজ্য (Trade): বর্তমানে এ অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ উন্নত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, স্পেন, তুরস্ক, প্রভৃতি দেশ হতে প্রচুর টাটকা বা শুষ্ক আঙুর ও অলিভ অয়েল ব্যাপকভাবে রপ্তানি করা হয়। উত্তর আফ্রিকা হতে রপ্তানি হয় খনিজ তেল। বিভিন্ন প্রকার ফল, মদ, রেশম, জলপাই, তেল, কাঠ প্রভৃতি রপ্তানির জন্য ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল প্রসিদ্ধ।
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more