hsc

ভূঅভ্যন্তরের স্তরবিন্যাস (পাঠ-২)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

2

(Layers of Earth Interior)

ভূকম্পন তরঙ্গ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, ভূপৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্রের দিকে পৃথিবীর তাপ, চাপ এবং গঠন উপাদানসমূহের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা ভূঅভ্যন্তরকে ৩টি মণ্ডলে বা স্তরে বিভক্ত করেছেন। যথা-

১. অশ্মমণ্ডল: গোলাকার পৃথিবীর একেবারে বাইরের অংশকে বলা হয় অশ্মমণ্ডল। এর গভীরতা ৭০ কি.মি. পর্যন্ত, ঘনত্ব ২.৯ কি.গ্রা/ঘনমিটার এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১০০০° সেঃ। সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম এর প্রধান উপাদান। প্রকৃতপক্ষে এটা ভূমন্ডলের খাড়া অংশ যা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এর বহিরাবরণকে বলা হয় ভূত্বক।

২. গুরুমণ্ডল: ভূত্বকের নিচ থেকে কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃভাগ পর্যন্ত গুরুমণ্ডল বিস্তৃত। এ মন্ডল গঠনকারী উপাদানগুলোর মধ্যে সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়ামের প্রাধান্য থাকায় ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী অস্ট্রিয়ান ভূবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড সুয়েস (১৮৩১-১৯১৪) একে 'সিমা' (SiMa) নামে অভিহিত করেন। আবার ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ ড. হ্যারল্ড জেফরিজ উপরের ক্ষারকীয় অংশটিকে মধ্যস্তর এবং নিচের অতি ক্ষারকীয় অংশটিকে নিম্নস্তর নামে আখ্যায়িত করেন।
গুরুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য: ভূবিজ্ঞানীদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ মন্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-এ স্তরের গভীরতা ১৫ কি. মি. থেকে ২৯০০ কি. মি. পর্যন্ত। এ স্তরটি প্রায় ২,৮৮৫ কি. মি. পুরু। এর ঊর্ধ্বাংশের শিলা কঠিন ও ভঙ্গুর যা ১০০ কি মি পর্যন্ত বিস্তৃত। গুরুমণ্ডলের উপরের অংশ প্রধানত ব্যাসল্ট জাতীয় পদার্থ দ্বারা গঠিত। তবে এ স্তরটি সিলিকন (Si), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), লোহা (Fe), কার্বন (C) প্রভৃতি উপাদানে গঠিত। এগুলোর মধ্যে প্রধান উপাদান সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম। এটি পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৮২.২৫ শতাংশ দখল করে আছে এবং এর ওজন পৃথিবীর মোট ওজনের শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ। এ স্তরের ঘনত্ব ৪.৩ থেকে ১০ কি.গ্রা/ঘনমিটার।

এই স্তরের ১০০ কি. মি. গভীরতায় ১১০০° সেলসিয়াস, ৭০০ কি. মি. গভীরতায় ১৯০০° সেলসিয়াস এবং কেন্দ্রমণ্ডলের বহিঃসীমানায় ৩০০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হয়। এ স্তরের নিচের দিকে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ১৪০০ টন চাপ রয়েছে। তবে এ স্তরের উপরের অংশের চাপ ২৬০ কি. গ্রা. এবং গড় চাপ ৮৮৫ কি. গ্রা.। এ স্তরে P তরঙ্গের গতিবেগ ৬.৯-১০.৭ কি. মি./সে.।

ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলের মাঝে একটি পাতলা স্তর রয়েছে যাকে মোহোবিচ্ছেদ বলা হয়। গুরুমণ্ডলটি যথেষ্ট উত্তপ্ত হলেও প্রচণ্ড চাপের প্রভাবে এ স্তরের উপাদানগুলো কঠিন ও চটচটে বা অর্ধতরল অবস্থায় রয়েছে। ভূত্বকের নিচে গুরুমণ্ডলের এরূপ অর্ধতরল স্তর নমনীয়মণ্ডল নামে পরিচিত, যা সাধারণত ৩০০ কি.মি. গভীরতায় দেখা যায়। গঠন উপাদানের গুরুত্বের তারতম্য অনুসারে এ মণ্ডলকে দুটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

ক. বহিঃগুরুমণ্ডল: এ স্তরটি ১০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ক্রোমিয়াম, লোহা, সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা গঠিত বলে একে ক্রোফেসিমা (Cr-Fe-Si-Ma) বলা হয়। এ স্তরেই নমনীয় মণ্ডল (asthenosphere) অবস্থিত।

খ. অন্তঃগুরুমণ্ডল: এ স্তরটি ৭০০ কি. মি. থেকে ২,৯০০ কি. মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। নিকেল (Ni), লোহা (Fe), সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দ্বারা গঠিত বলে একে নিফেসিমা (Ni-Fe-Si-Ma) বলা হয়।

৩. কেন্দ্রমণ্ডল: ভূকম্পন তরঙ্গ এবং অন্যান্য তথ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভূবিজ্ঞানীগণ কেন্দ্রমণ্ডলের বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। তাদের মতে, এ মণ্ডলটি গুরুমণ্ডল (২,৮৮৫ কি. মি.) থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র (৬,৩৭১ কি. মি.) পর্যন্ত বিস্তৃত। এ মণ্ডলের গঠন উপাদানের মধ্যে নিকেল (Ni) এবং লোহা (Fe) প্রধান বলে ভূবিজ্ঞানী সুয়েস এর নাম দেন 'নিফে' (NiFe)। আবার ইংল্যান্ডের ভূবিদ আর্থার হোমস (১৮৯০-১৯৬৫) একে 'অন্তঃস্থল' নামে অভিহিত করেন।

কেন্দ্রমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য: ভূবিদগণ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রমণ্ডলের যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন তা নিচে দেওয়া হলো- এ স্তরটি গুরুমণ্ডলের নিচে অবস্থিত। অর্থাৎ ২,৮৮৫ থেকে ৬,৩৭১ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা (গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের সংযোগস্থলকে গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা বলে) থেকে এর গভীরতা ৩,৪৮৬ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীদের ধারণা এ মন্ডলটি লৌহ, নিকেল, পারদ, সীসা প্রভৃতি কঠিন ও ভারী পদার্থ দ্বারা গঠিত। এ মণ্ডলটি পৃথিবীর মোট আয়তনের শতকরা প্রায় ১৬.২ ভাগ স্থান দখল করলেও এর ওজন পৃথিবীর মোট ওজনের শতকরা ৩১.৫ ভাগ। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ। এই স্তরের ঘনত্ব ১১.৮-১৩.৬ কি.গ্রা/ঘনমিটার। এ স্তরের বহিঃকেন্দ্র তরল ও চটচটে আঠালো অবস্থায় রয়েছে বলে S তরঙ্গ (transverse wave) প্রবেশ করতে পারে না। কারণ S তরঙ্গ তরল পদার্থের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে না। P তরঙ্গের (longitudinal wave) গতিবেগ বহিঃকেন্দ্রে ১০.৩ কি.মি./সে. থাকলেও অন্তঃকেন্দ্রে এ গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে ১১.২ কি.মি./সে. পর্যন্ত হয়।

কেন্দ্রমণ্ডলের শুরুতে তাপমাত্রা ৩০০০° সেলসিয়াস এবং অন্তঃকেন্দ্রে এ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ৫০০০০ সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ভূপৃষ্ঠের তুলনায় কেন্দ্রমণ্ডলের চাপ অনেক বেশি। গড় চাপ ৩,৬৮০ কিলোবার। উপরের অংশে ৩৩৪০ কিলোবার এবং নিচের অংশে প্রায় ৩৭০০ কিলোবার। এ প্রবল চাপের কারণে কেন্দ্রমণ্ডলের ভিতরের উপাদানগুলো কঠিন অবস্থায় রয়েছে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...