(Crust and Internal Structure of the Earth)
আদিতে পৃথিবী একটি উত্তপ্ত বাষ্পপিণ্ড ছিল। ক্রমান্বয়ে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে প্রথমে তরল ও পরে জমাট বেঁধে পৃথিবীর উপরিভাগে একটি কঠিন পাতলা আবরণের সৃষ্টি হয়। আর ভূপৃষ্ঠের এ কঠিন বহিরাবরণই ভূত্বক বা অশ্মমণ্ডল নামে পরিচিত। ভূত্বকের উপরাংশে গ্রানাইট নামক শিলার পরিমাণ বেশি। অপরদিকে, মধ্যবর্তী স্তরটি ব্যাসল্ট জাতীয় শিলা দ্বারা গঠিত ও নিম্নস্তরে অলিভিন নামক খনিজ অধিক পরিমাণ দেখা যায়।
ভূত্বক: ভূত্বক অশ্মমণ্ডলের উপরের স্তর। এর গভীরতা মহাদেশের নিচে সর্বোচ্চ এবং মহাসাগরের নিচে সর্বনিম্ন। গড় গভীরতা ২০কিলোমিটার। ভূত্বকের ঘনত্ব ২.২-২.৯ কি.গ্রা/ঘনমিটার, আপেক্ষিক গুরুত্ব ৩ এর মধ্যে এবং তাপমাত্রা গভীরতা ভেদে সেন্টিগ্রেড (স্থানভেদে কমবেশি হতে পারে)। মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় ভূত্বকের সাধারণ অবস্থা নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা যায়-
মহাদেশীয় ভূত্বক: এটি সমগ্র ভূমণ্ডলের ০.৩৭৪% এবং এর গভীরতা ৭০ কিলোমিটার (৪৩ মাইল) পর্যন্ত হতে পারে। অশ্মমন্ডলের উপরাংশের কঠিন ভূত্বক নানাপ্রকার খনিজ ও শিলা দ্বারা গঠিত। এর মধ্যে কোয়ার্টজ (SiO2) ও ফেলসপার (সিলিকেট) প্রধান খনিজ উপাদান।
মহাদেশীয় ভূত্বক যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিবর্তনশীল। জার্মান ভূগোলবিদ আলফ্রেড ওয়েগনারের মতে, মহাদেশগুলো অতীতে একটিমাত্র 'প্যানজিয়া' নামক ভূখণ্ড বা মহাদেশ হিসেবে ছিল যা পরবর্তীতে উষ্ণ গুরুমণ্ডল থেকে সঞ্চায়িত পরিচলন স্রোতের প্রভাবে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমান অবস্থাপ্রাপ্ত হয়েছে। প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব অনুযায়ী, সমগ্র ভূপৃষ্ঠে (মহাসাগরসহ) ৭টি বৃহদাকার প্লেট এবং কমপক্ষে ২০টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লেট আছে যা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসছে।
উপাদান: নানাপ্রকার আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ খনিজ সম্ভার মহাদেশীয় ভূ-ত্বকের প্রধান উপাদান। ভূত্বকের উপরিভাগে রয়েছে অত্যন্ত পাতলা হিউমাস সমৃদ্ধ মৃত্তিকাস্তর যাতে উদ্ভিদরাজি ও প্রাণিকুল বসবাস করছে। এই পাতলা স্তরটির প্রধান প্রধান উপাদান হলো: অক্সিজেন ( )৪২.৮%, সিলিকন (Si) ২৭.৮%, অ্যালুমিনিয়াম (Al) ৮%, লৌহ (Fe) ৫%, ক্যালসিয়াম (Ca) ৩.৭%, সোডিয়াম (Na) ২.৮%, পটাসিয়াম (K) ২.৬%, ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ২.১%, নাইট্রোজেন, জিংক, তামা ও ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে অক্সিজেন
ও সিলিকনের (Si) সাথে অন্যান্য উপাদান মিলে সিলিকেট ও অক্সাইড তৈরি করে যা শিলা হিসেবে আখ্যায়িত।
শিলার স্তর: ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবেগের ওপর নির্ভর করে ভূত্বকের শিলাস্তরকে নিম্নের তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:
১. গ্রানাইট জাতীয় আম্লিক শিলাস্তর: এখানে ভূমিকম্পের P তরঙ্গ প্রতি সেকেন্ডে ৬.২ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত
হয়। অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদান দ্বারা এই স্তরটি গঠিত। তবে এদের মধ্যে সিলিকা (Si) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al) বেশি থাকায় স্তরটি সিয়াল (SiAl) নামে পরিচিত। স্তরটির আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৭-২.৯। গ্রানাইট স্তরে কোয়ার্টজ ও ফেলসপার বেশি থাকায় একে ফেলসিক স্তরও বলা হয়।
২. ব্যাসল্ট জাতীয় ক্ষারকীয় শিলাস্তর: ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবেগ এখানে প্রতি সেকেন্ডে ৭ কিলোমিটার। গ্রানাইট
স্তরের ঠিক নিচে এই শিলাস্তরের আপেক্ষিক গুরুত্ব গড়ে ৩.২। এখানে সিলিকার পরিমাণ গ্রানাইট স্তর অপেক্ষা কম (৪৫%-৫৫% যেখানে গ্রানাইট ৭০%)। অপর প্রধান উপাদান ম্যাগনেসিয়ামও সিলিকার প্রায় সমপরিমাণে (৫৫%-৪৫%) থাকে। প্রধান দুই উপাদানের ভিত্তিতে স্তরটির নামকরণ করা হয়েছে Sima (সিমা)।
কনরাড বিযুক্তি: গ্রানাইট ও ব্যাসল্ট জাতীয় শিলাস্তরের সীমারেখা কনরাড বিযুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত।
৩. অলিভিন জাতীয় অতিক্ষারকীয় শিলাস্তর: এই শিলাস্তরে P তরঙ্গের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৮ কিলোমিটার হয়। অনেকে একে গুরুমণ্ডলের অংশ বলে থাকেন। কারণ এর অবস্থান 'মোহো' বিযুক্তির পর যেখান থেকে গুরুমণ্ডলের শুরু। তবে এই কঠিন স্তরসহ ভূত্বক অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসছে বিধায় অনেকে একে ভূত্বকের অংশ হিসেবে ধরাকে যুক্তিযুক্ত মনে করেন। মোহো বিযুক্তি হচ্ছে ভূত্বকের ব্যাসল্ট জাতীয় শিলাস্তর ও অলিভিন শিলাস্তরের সীমানা।
মহাসাগরীয় ভূত্বক: এটি সমগ্র ভূমন্ডলের ০.০৯৯%; গভীরতা ০-১০ কি.মি. (০-৬ মাইল)। মহাসাগরীয় ভূত্বকের অধিকাংশ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট। মহাসাগরীয় শৈলশিরাগুলো ৪০,০০০ কিলোমিটার (২৫,০০০ মাইল) বিস্তৃত আগ্নেয় নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে; প্রতিবছর সমুদ্রের তলদেশে ১৭ কিউবিক কিলোমিটার আগ্নেয় (ব্যাসল্ট) ভূত্বক সৃষ্টি হয় যা ক্রমেই উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ (প্রশান্ত মহাসাগর) ও আইসল্যান্ড (উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর) সমুদ্রতল হতে ক্রমোচ্চতাপ্রাপ্ত আগ্নেয়দ্বীপের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মহাসাগরীয় ভূত্বক মূলত থোলেইটিক জাতীয় ব্যাসল্ট দ্বারা গঠিত। এই জাতীয় ব্যাসল্টে কোন অলিভিন মিশ্রিত থাকে না। এটি অত্যন্ত গাঢ় রং এর আগ্নেয় পদার্থ যা তরল লাভা শীতলীকরণের ফলে সৃষ্ট। দানাগুলো এত মিহি যা, শুধু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়। মহাসাগরীয় ভূত্বকের গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩ গ্রাম।

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন (Internal Structure of the Earth)
ভূঅভ্যন্তরের গঠন কাঠামো (Internal Structure) সম্পর্কে জানার জন্য ভূবিজ্ঞানীগণ নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মানুষের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে খুব নগণ্য অংশমাত্র (৬,৩৭১ কি. মি. এর মধ্যে মাত্র ৬ কি. মি.)। তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে জানার জন্য ভূকম্পন তরঙ্গ ধারণকৃত জরিপ, জ্যোতি পদার্থ, ভূচুম্বকত্ব ও ভূবিদ্যুৎ প্রভৃতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে তারা এসব পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে তিন ধরনের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন। এগুলো হলো-
i. পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য এবং ঘনত্ব সম্পর্কিত তথ্য
ii. ভূকম্পন তরঙ্গের গতি প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা এবং
iii. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উদগিরিত লাভার নমুনা পরীক্ষা
তাছাড়া সৌরজগতের গঠন প্রক্রিয়া এবং পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা জ্বলন্ত বাষ্পপিণ্ড থেকে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে কালক্রমে পৃথিবী তরল ও কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। সৃষ্টির এমন প্রক্রিয়ায় ভারি উপাদানসমূহ পৃথিবীর কেন্দ্রে এবং অপেক্ষাকৃত হালকা উপাদানগুলো উপরের দিকে পর্যায়ক্রমে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হয়েছে।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই
Read more