পাঠ-১: ভৌগোলিক পরিবেশ ও বসতির ভিন্নতা

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(Geographical Environment and Variation of Settlement)

বসতির সংজ্ঞা

বসতি বলতে শুধু ঘরবাড়িকে বোঝানো হয় না বরং ভূগোলে বসতি বা Settlement ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মানব বসতির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করা হলো-

* "স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নির্মিত আবাসস্থলকে বসতি বলা হয়।"- ব্রিটিশ ভূগোলবিদ Neil Robert Smith (Dictionary of Geography)।

*"প্রয়োজনের নিমিত্তে কোনো স্থানে এক বা একাধিক মানুষ যখন বসবাস করতে শুরু করে, তখন তাকে বসতি বলে"- ফরাসি ভূগোলবিদ Jeans Vanier।

* "Settlement is the study of forms of the cultural landscape."- আমেরিকান ভূগোলবিদ Terry G. Jordan 1

*"বসতি বলতে এক বা একাধিক আবাসস্থল, জমি, পথ-ঘাট, পার্ক বা বাগান হিসাবে ব্যবহৃত খোলা জায়গাসহ বসবাসের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার প্রপঞ্চকে (phenomena) বুঝায়।"- আমেরিকান ভূগোলবিদ অধ্যাপক জন বুকানন।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা বলা যেতে পারে যে- কোনো কোনো একটি একটি স্থানে : মানুষ একত্রিত হয়ে স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য প্রকৃতির বুকে যে অবয়ব তৈরি করে তাকে বসতি বা Settlement বলে।

ভৌগোলিক পরিবেশ ও বসতি (Geographical Environment and Settlement)

মানুষ সবসময় তার পছন্দমতো জায়গায় বসতি স্থাপন করতে পারে না। কোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সেই স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ, অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের উপাদানসমূহ অনুকূলে থাকতে হবে। এই উভয় প্রকার পরিবেশ কোনো স্থানে মানব বসতি স্থাপনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
যে সমস্ত ভৌগোলিক পরিবেশ মানব বসতি স্থাপনে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে থাকে সেগুলো নিম্নরূপ-

প্রাকৃতিক পরিবেশ: প্রাকৃতিক পরিবেশ মানব বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করে থাকে। কোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সে স্থানের ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, পানির সহজলভ্যতা প্রভৃতি বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হয়। নিচে এ বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-

ক. ভূপ্রকৃতি: বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথমে যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয় সেটি হচ্ছে ভূপ্রকৃতি। সমতল ভূমি অপেক্ষা পাহাড়ি ও বন্দুর অঞ্চলে জীবনযাত্রা যথেষ্ট কষ্টদায়ক বলে মানুষ বসতি স্থাপনে সমতল ভূমিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। যেমন: ঢাকা, ময়মনসিংহ অঞ্চল।
খ. মৃত্তিকা: উর্বর মাটিতে কৃষিকাজ ভালো হয়। ভালো ফল জন্মে। বালুকাময়, পাহাড়ি বা অনুর্বর মাটিতে ভালো ফসল জন্মে না। এজন্য অনুর্বর মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চল অপেক্ষা উর্বর মৃত্তিকাযুক্ত অঞ্চলে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। যেমন- নদী তীরবর্তী পলল মৃত্তিকাবিশিষ্ট অঞ্চল।
গ. জলবায়ু: যে সমস্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত সূর্যতাপ পাওয়া যায় ও পরিমিত বৃষ্টিপাত হয় সেসব জায়গা বসবাসের অনুকূল। এরূপ স্থানে কৃষির বিস্তার ঘটে। ফলে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। যেমন: মৌসুমি, নাতিশীতোষ্ণ ও ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চল। পক্ষান্তরে, দূর্গম মরু বা মেরু অঞ্চল অথবা অধিক তাপ বা শৈত্যপ্রবাহবিশিষ্ট অঞ্চলে বসবাস কষ্টসাধ্য বলে কম বসতি গড়ে ওঠে।
ঘ. সূর্যালোক: যে সমস্ত অঞ্চলে প্রয়োজনের অধিক বা কম মাত্রায় সূর্যের আলো পড়ে, সে সমস্ত অঞ্চলে ভালো কৃষিকাজ করা যায় না। এ কারণে মরু বা মেরু অঞ্চল অপেক্ষা ক্রান্তীয় অঞ্চলে অধিক বসতি স্থাপিত হয়।
ঙ. পানির সহজলভ্যতা: দৈনন্দিন জীবনে পানির ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রাচীনকাল থেকেই পানির উৎসের কাছে বা পানির উৎসকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠেছে। যেমন- বিভিন্ন দেশের নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বসতি। যে সমস্ত অঞ্চলে পানির সহজলভ্যতা কম, সে সমস্ত অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত কম বসতি স্থাপিত হয়। যেমন: সাহারা মরুভূমি বা তুন্দ্রা অঞ্চল।
সামাজিক পরিবেশ: প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নতুন পরিবেশ তৈরি করে তখন তাকে সামাজিক পরিবেশ বলে। মানব বসতি নির্মাণে সামাজিক পরিবেশ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন-

ক. অর্থনীতি: যে সমস্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ বা খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় অথবা কাজের ভালো ক্ষেত্র আছে, সেখানে অধিক বসতি গড়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, কাজের ভালো ক্ষেত্র না থাকলে অথবা অর্থ আয়ের উৎস কম থাকলে সেখানে মানুষ বসবাস করতে উৎসাহী হয় না বলে কম বসতি গড়ে ওঠে।
খ. সংস্কৃতিঃ একই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ। একত্রে বসবাস করতে চায়। এজন্য পাহাড়ি উপজাতিরা এক জায়গায়, সমতলের অধিবাসীরা অন্য জায়গায় বসতি স্থাপন করতে চায়। বিশ্বের সর্বত্রই একই সংস্কৃতির লোক এক জায়গায় বসতি স্থাপন করে থাকে।
গ. সমাজ: একই সামাজিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষ একত্রে বসবাসের জন্য পৃথক বসতি গড়ে তোলে। যেমন: শহুরে সমাজের দরিদ্র শ্রেণি নগরে বস্তি গড়ে তোলে।

ঘ. রাজনীতি: রাজনৈতিক কারণেও অনেক সময় বসতির স্থান পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন বসতি তৈরি হয়। যেমন-সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে ইসরাইল রাষ্ট্র কর্তৃক অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি নির্মাণ। আবার মায়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে (বাংলাদেশ সরকারের অনুকূলে) কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা জাতি কর্তৃক বসতি স্থাপন। তবে রাজনৈতিক কারণে বসতি স্থাপনজনিত সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা যায়। যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের আলোচনা ফলপ্রসু হলে কক্সবাজারের বসতি স্থাপনজনিত সমস্যা সমাধান করা যাবে।

উপরে উল্লিখিত কারণ ছাড়াও নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত কারণ, ব্যক্তিগত পছন্দ, সম্পদজনিত কারণ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠে।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...