(Pollution caused by Human and its prevention: Air Pollution)
মানবসৃষ্ট দূষণ ও তা রোধের উপায়: বায়ু দূষণ
দূষণ প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাধারণত পরিবেশে দুই ধরনের দূষণ সংঘটিত হয়। প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে যেমন পরিবেশ দূষিত হয় তেমনি মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও পরিবেশ ব্যাপকভাবে দূষিত হয়। দূষণের ফলে মানুষ ও জীবজন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দূষণজনিত কারণে বিশ্ব উষ্ণায়নের সৃষ্টি হয়ে পৃথিবীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ছে। মানুষ ও প্রকৃতি উভয় মিলে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন- মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দকে দূষিত করছে। এই পাঠে আমরা জানবো মানুষের দ্বারা কীভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং এই দূষণ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
মানবসৃষ্ট দূষক পদার্থ: মানবসৃষ্ট দূষক পদার্থের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ত দূষক, এসিড, জৈব বর্জ্য পদার্থ, শিল্প কারখানার বর্জ্য, কীটনাশক পদার্থ, তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইত্যাদি। তেলকূপ খনন কাজের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানিতে ব্রাইন (লবণাক্ত পানি) নির্গত হয়ে থাকে। কয়লা, তামা অনুসন্ধান কাজের সময় পানি সরবরাহ লাইনে এসিড মিশে অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি করে।
বায়ুদূষণের মানবসৃষ্ট কারণ (Air pollution caused by human)
প্রাকৃতিক কারণে যেমন বায়ুদূষণ ঘটে তেমনি মানুষের কর্মকাণ্ডেও কারণগুলো হলো
১. মোটর যান: মোটর যান থেকে প্রতিদিন প্রচুর দূষক পদার্থ নির্গত হয়ে বায়ুকে দূষিত করছে। মোটর গাড়ির কারণে বায়ুদূষণের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোটর যান থেকে যে উপাদানগুলো নির্গত হয়ে বায়ুকে দূষিত করছে সেগুলো হলো হাইড্রোকার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, আলোক রাসায়নিক ধোঁয়া ইত্যাদি। এই আলোক রাসায়নিক ধোঁয়া আমাদের শহর কেন্দ্রগুলোতে অধিক দেখা যায়।
২. শিল্প কারখানা: শিল্প কারখানার বিভিন্ন পদার্থ বায়ুর সাথে মিশে বায়ুকে দূষিত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বায়ু দূষণের একটি বড় অংশ শিল্প কারখানার জন্য হয়ে থাকে। বায়ু দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী হচ্ছে পেট্রোলিয়াম শোধনাগার, সার ও সিন্থেটিক রাবার উৎপাদক, সাজসজ্জা ও কাগজশিল্প ইত্যাদি। শিল্পায়ন প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সাহায্য করে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করে। কিন্তু বায়ু দূষণের মাধ্যমে পরিবেশের গুণগত মান নষ্ট হয়।
৩. পাওয়ার প্লান্ট: যুক্তরাষ্ট্রে ৯০% এর বেশি বৈদ্যুতিক শক্তি তেল ও কয়লা জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। পাওয়ার প্লান্ট এর জ্বালানি হিসেবে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় সালফার যা সালফার ডাইঅক্সাইড হিসেবে বায়ুতে মিশে বায়ুকে দূষিত করে।
৪. ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC-Chloro-fluoro carbon): CFC হচ্ছে ক্লোরিন, ফ্লোরিন ও কার্বনের একটি উদ্বায়ী যৌগ। এটি একটি গ্যাস। এটি রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার, প্লাস্টিক ও রং তৈরির কারখানা হতে নির্গত হয়। CFC বায়ুমণ্ডলের ওজোন (Ozone) স্তরকে ক্রমশ ধ্বংস করছে। স্বাভাবিকভাবে এক অণু CFC অসংখ্য ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। ইতোমধ্যেই ওজোনস্তর অনেক জায়গায় পাতলা হয়ে পড়েছে এবং কোথাও কোথাও ছিদ্র (hole) হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ওজোনস্তর ছিদ্র হলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ও কসমিক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও পরে অন্যান্য গাছপালাকে ধ্বংস করে দেবে। সেই সাথে প্রাণিকুলেরও ক্ষতি হবে প্রচুর। ক্যানসার ও অন্যান্য রোগের প্রকোপও বেড়ে যাবে। তাই CFC এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার তাগিদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৫. আবর্জনাসমূহ: উন্মুক্ত স্থানে মানুষ পৌরবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, বাণিজ্যিক এলাকার বর্জ্য পুড়িয়ে বায়ুকে নানাভাবে দূষিত করছে। একটি সাধারণ ঘরের আবর্জনা পোড়ালে প্রতি টন ময়লার জন্য ২৫ পাউন্ড দূষক নির্গত হয়, যা বায়ুকে দূষিত করছে।
৬. পরিবহন সেবা: পরিবহন সেবার মাধ্যমে মানুষ বায়ুকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। বন্দর এলাকায় জাহাজের ধোঁয়া ও বায়ু দূষণের জন্য দায়ী।
৭. বাণিজ্যিক ও কৃষিকাজ: বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে কোনো কিছুর ধ্বংস, নির্মাণ, পেইন্টিং, স্প্রে ইত্যাদি। এছাড়া কৃষিজমিতে ফসল উঠানোর পর আগুন ধরানো; কৃষি জমিতে সার, কীটনাশক ব্যবহারে তা বায়ুর সাথে মিশে বায়ুকে দূষিত করছে।
মানবসৃষ্ট বায়ুদূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Prevention of air pollution caused by human)
মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ বায়ুকে যেভাবে দূষিত করছে তাতে জীবন ও পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে নিম্নোক্ত পন্থাগুলো অবলম্বন করা যায়-
১. নিদিষ্ট স্থানে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা: যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে তুললে বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পায়। যেখানে শিল্প
কারখানা গড়ে উঠবে সেখানে আবাসিক এলাকা থাকবে না। কলকারখানার চিমনি উঁচু করে তৈরি করা এবং কারখানার চারিদিকে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা।
২. বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার: কয়লা, খনিজ তেল, গ্যাস শক্তির পরিবর্তে জ্বালানির উৎস হিসেবে বেশি পরিমাণে সৌর, বায়ু, ভূতাপীয় শক্তি, জৈব গ্যাস ব্যবহার করলে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
৩. বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি: বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অরণ্যভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা আবশ্যক। বৃক্ষ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ঘাটতি গাছপালাই পূরণ করে থাকে। গাছপালা শুধু অক্সিজেন সরবরাহ এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হয় না; গাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বায়ু শোষণ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
৪. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা: ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারিভাবে বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা যায়। যানজট প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট রাস্তায় নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচল করলে যানবাহনের জ্বালানি দূষণ কমানো সম্ভব, যা বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত তা হচ্ছে ট্রাফিক সিগন্যাল, একমুখী সড়ক তৈরি, যানবাহন পার্কিং সুবিধার উন্নতি, বিভিন্ন গতির গাড়ির জন্য ভিন্ন ভিন্ন সড়ক তৈরি ও ব্যবহার। সর্বোপরি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি যানবাহন মালিক ও চালকদেরও সচেতন হতে হবে।
৫. মানুষের সচেতনতা: রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরো কার্বন ওজোন স্তরের যে মারাত্মক ক্ষতি করে সে সম্পর্কে মানুষের মধ্যে কোনো সচেতনতা নাই। কিন্তু এ সম্পর্কে মানুষ সচেতন থাকলে বায়ু দূষণ প্রতিরোধ করা যাবে।
৬. বায়ুর গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন: বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সরকার বায়ুর গুণগত মান মনিটরিং ও মূল্যায়ন করতে পারে। মান পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নে সরকার কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, যা বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more