(Air Pressure Belt)
পৃথিবীর মাধ্যকর্ষণ শক্তির প্রভাবে বায়ুমণ্ডল ভূপৃষ্ঠের প্রতি বর্গমিটার স্থানের উপর যে বল প্রয়োগ কেের তাকে বায়ুচাপ বলে। চাপীয় মানের পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন চাপকোষ বলয় আকারে পৃথিবীকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে আছে যাদেরকে চাপবলয় বলা হয়। বিভিন্ন অক্ষাংশে তাপের পার্থক্য এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত কারণে চাপ বলয়গুলো সৃষ্টি হয়েছে। চাপ বলয়গুলো দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা: ক. উচ্চচাপ বলয় ও খ. নিম্নচাপ বলয়।
ক. উচ্চচাপ বলয় (High pressure belt / zone): কোনো চাপ কক্ষের কেন্দ্রে যদি উচ্চচাপ থাকে এবং চারপাশে বায়ুচাপ তুলনামূলকভাবে কমতে থাকে তখন তাকে উচ্চচাপ অঞ্চল বলে।
খ . নিম্নচাপ বলয় (Low pressure belt/zone): কোনো চাপ কক্ষের কেন্দ্রে যদি নিম্নচাপ ও বাইরের দিকে বায়ুচাপ তুলনামূলকভাবে বাড়তে থাকে, তবে এ অবস্থায় তাকে নিম্নচাপ অঞ্চল বলে। পৃথিবীতে সর্বমোট সাতটি চাপবলয় আছে।
উৎপত্তিগত দিক থেকে বায়ুচাপ বলয়গুলো দুইটি বড় ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়-
১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় এবং মেরু উচ্চচাপ বলয় (Thermally induced pressure belt)
২. উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় এবং উপমেরু নিম্নচাপ বলয় (Dynamically induced pressure belt)
সামগ্রিকভাবে চাপ বলয়গুলো হলো-
(১) নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা শান্ত বলয়;
(২-৩) উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়: (২) কর্কটীয় ও (৩) মকরীয় উচ্চচাপ বলয়
(৪-৫) মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়: (৪) সুমেরু ও (৫) কুমেরু বৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়;
(৬-৭) মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়: (৬) উত্তর ও (৭) দক্ষিণ মেরুদেশীয় বা কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।

১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা শান্ত বলয় (Equatorial low pressure belt or doldrums): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় নিরক্ষরেখার উভয় দিকে অক্ষাংশের মধ্যে বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অবস্থিত। পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য বছরের বিভিন্ন সময় এই চাপবলয় থেকে অক্ষাংশের মধ্যে যাওয়া-আসা করে। এই নিম্নচাপ বলয় প্রধানত তিনটি কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো হলো-
i. নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য প্রায় সারাবছর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে প্রসারিত হয় এবং উপরে উঠে যায়।
ii. এই অঞ্চলে স্থলভাগ অপেক্ষা জলভাগ বেশি হওয়ায় প্রখর সূর্যতাপে অধিকতর জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু হালকা হওয়ায় ওপরে উঠে যায়।
iii. এছাড়া এই অঞ্চলের উঁচু স্তরে উষ্ণ, আর্দ্র ও লঘু বায়ু পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য উত্তর-দক্ষিণ উভয় দিকে ছিটকে যায়।
উপরিউক্ত কারণেই বিশেষ করে অত্যধিক উষ্ণতার জন্যই বলয়টি নিম্নচাপ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।


Inter Tropical Convergence Zone বা সংক্ষেপে ITCZ বা আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল নিরক্ষীয় শান্তবলয়ে অবস্থিত একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলটিই মূলত ডোলড্রাম (doldrum), যেখানে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাণিজ্য বায়ু পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং বজ্রঝড় সৃষ্টি করে।

আবহাওয়ার অবস্থা: নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুর পরিচলন স্রোতে কিউমুলাস মেঘের সৃষ্টি হয়। বজ্র-বিদ্যুৎসহ প্রবল পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ অঞ্চলে সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়, বিশেষ করে বিকেলের দিকে। বাতাসে অধিক জলীয়বাষ্প থাকায় আবহাওয়া গুমোট থাকে ও ভ্যাপসা গরম পড়ে। এতে রীতিমতো গা ঘামে। ফলে শরীরে অবসন্নতা আসে ও মানুষের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়।
(২-৩) উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় (subtropical high pressure belt: tropic of cancer and tropic of capricorn high pressure belt): নিরক্ষরেখার উভয়পাশে ২৫০-৩৫০ অক্ষাংশের মধ্যে উচ্চচাপ বলয় দু'টি অবস্থিত। এখানে বায়ুপ্রবাহের কয়েক রকম অবস্থা দেখা যায়।
i. নিরক্ষীয় অঞ্চলে উঊর্ধ্বে প্রবাহিত উষ্ণ, আর্দ্র ও হালকা বায়ু পৃথিবীর আবর্তনের ফলে উত্তরে ও দক্ষিণে ছিটকে যায়। এ বায়ু শীতল ও ভারি হয়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে নেমে আসে। পরে কিছুটা উষ্ণ হয়ে উঠে।
ii. সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারি বাতাস নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। এই দু'দিকের বায়ুপ্রবাহ যথাক্রমে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার নিকট নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে আগত বায়ুপ্রবাহের সজো পরস্পর মিলিত হয় এবং চাপ বৃদ্ধি পায়। এভাবে উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়।
iii. উভয় ক্রান্তীয় অঞ্চলে বায়ুর প্রবাহ নিম্নমুখী হওয়ায় বায়ুর পার্শ্বপ্রবাহ লক্ষ করা যায় না। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলের মতো এ অঞ্চলেও বায়ুপ্রবাহে সর্বদা শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। তাই এদের ক্রান্তীয় শান্তবলয় (tropical calms) বলে অভিহিত করা হয়।
এই উচ্চচাপ বলয়ের সর্বত্র একইরূপ অবস্থা থাকে না। কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
অশ্ব অক্ষাংশ (Horse latitude): আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর বিস্তৃত কর্কটীয় শান্তবলয় অশ্ব অক্ষাংশ নামে পরিচিত। আগের দিনে সমুদ্রে পালতোলা জাহাজগুলো বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলাচল করত। এ অঞ্চলে বায়ুর পার্শ্ব-প্রবাহ না থাকায় প্রাচীনকালে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ বা পূর্ব এলাকা থেকে উত্তর-আমেরিকামুখী ঘোড়া বোঝাই জাহাজ এ অঞ্চলে এসে আটকা পড়ত। তখন খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে ঘোড়াগুলোকে সাগর বক্ষে নিক্ষেপ করে জাহাজ হালকা করা হতো। সে থেকে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে অশ্ব অক্ষাংশ।
জলবায়ুর অবস্থা: এ অঞ্চলে বায়ু ওপর থেকে নিচে নেমে আসায় বায়ু শুষ্ক থাকে (জলীয়বাষ্প থাকে না)। বিশ্বের বড়। বড় মরুভূমিগুলো; যথা- আফ্রিকার সাহারা ও কালাহারি, এশিয়ার আরব মরুভূমি, অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি এ অঞ্চলে অবস্থিত। আর উপকূলের নিকটে পাহাড়-পর্বত থাকলে অনুবাত পার্শ্বে বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড় হয়।
(৪-৫) মেরুবৃত্তীয় নিম্নচাপ বলয়: সুমেরু ও কুমেরু বৃত্তীয় নিম্নচাপ বলয় (subpolar low pressure belts of both hemispheres): উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে অক্ষাংশ জুড়ে সুমেরু বৃত্ত ও কুমেরু বৃত্ত অঞ্চলে নিম্নচাপ বলয় অবস্থিত। এখানে ভূপৃষ্ঠে সর্বনিম্ন চাপবলয় বিদ্যমান। এ অঞ্চলে কতকগুলো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেমন:
i. পৃথিবীর আবর্তনের বেগ মেরুদ্বয় অপেক্ষা দুই মেরুবৃত্ত প্রদেশে অধিক এবং বহির্মুখী শক্তি কার্যকরী হয়। এ কারণে এই দুই অঞ্চলে বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে বিক্ষিপ্ত হয়।
ii. বিশেষ করে সুমেরু বৃত্তে শীত-গ্রীষ্ম ভেদে উত্তর গোলার্ধে চাপ বলয়গুলো কম-বেশি বিস্তৃত হয়। পৃথিবীর আবর্তনের ফলে এখানে বায়ুপ্রবাহ ভেঙে বিরাট ঘূর্ণিতে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বগামী হয়। ঘূর্ণিগুলোর কেন্দ্রস্থলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এ সময় এই অঞ্চলে উষ্ণ পশ্চিমা বায়ু শীতল মেরু বায়ুর ওপর উঠে গিয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
iii. পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ ও মেরু বায়ুপ্রবাহ যেখানে মিলিত হয়েছে তাকে মেরুপ্রদেশীয় শান্তবলয় বলে।
iv. এ অঞ্চলে বায়ুর পরিমাণ কমে যাওয়ায় বায়ুর চাপ নিম্ন হয়। উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগের প্রাধান্য থাকায় বায়ুপ্রবাহের জটিল আবর্তে শীতকালে ঝড়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মকাল বেশ মৃদু শান্ত থাকে। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় শীত-গ্রীষ্মের উষ্ণতার পার্থক্য কম থাকে। এই চাপবলয়ে যেখানে জলভাগ আছে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
(৬-৭) মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় (Polar high pressure belt of both hemispheres): এই এলাকায় উচ্চচাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণগুলো হলো-
i. উভয় মেরু এলাকা বরফাচ্ছন্ন; প্রচণ্ড শীতল অবস্থা বিরাজ করে (উষ্ণতা-০°c হয়)। বাতাস খুব ঠাণ্ডা ও ভারি হয়।
ii. সূর্যকিরণের অভাবে জলীয়বাষ্প খুব কম থাকে।
iii. পৃথিবীর আবর্তনে মেরুবৃত্তীয় নিম্নচাপ এলাকায় ছিটকে যাওয়া ঊর্ধ্বগামী বাতাস শীতল ও ভারি হয়ে এখানে নেমে আসে। ফলে এখানে চাপ বৃদ্ধি পায়।
মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন: উত্তর মেরুর উচ্চচাপ বলয়কে সুমেরু উচ্চচাপ বলয় (arctic high pressure belt) এবং দক্ষিণ মেরুর উচ্চচাপ বলয়কে কুমেরু উচ্চচাপ বলয় (antarctic high presure belt) বলে। এসব এলাকার আবহাওয়ার তথ্য তেমন পাওয়া যায় না।
জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Read more