hsc

পাঠ-৬: বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শিল্প: চিনি

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Major Industries of Bangladesh)

দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নতির মূলে রয়েছে শিল্পোন্নয়ন। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় শিল্পক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি লাভকরতে পারেনি। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৫.১৪ শতাংশ। বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি শিল্পে ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করছে।

চিনি শিল্প (Sugar Industry)

ঔপনিবেশিক সময় থেকে এদেশে চিনিকল স্থাপন শুরু হয়েছে। চিনি শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি শিল্প হলেও এ শিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

ক. বাংলাদেশে চিনি শিল্প গড়ে ওঠার ভৌগোলিক কারণসমূহ: বাংলাদেশে চিনি শিল্পের উন্নতির মূলে রয়েছে কতিপয় প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রভাব। নিচে এসব উপাদানসমূহের বিবরণ দেওয়া হলো:

প্রাকৃতিক উপাদান (Physical elements)

১. কাঁচামালের সহজলভ্যতা: চিনি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আখ। । বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি জেলায় প্রচুর আখ চাষ হয়। আখ উৎপাদনকারী এসব অঞ্চলে চিনি কলগুলো স্থাপিত হওয়ায় সহজেই কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়। অপরদিকে দক্ষিণাঞ্চলে আখের চাষ না হওয়ায় চিনি শিল্প গড়ে ওঠেনি।

২. শক্তি সম্পদের প্রাচুর্য: বাংলাদেশে চিনিকলগুলোতে সুলভে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
৩. জলবায়ু: বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে আখের ফলন ভালো হয়। ফলে এদেশে প্রতি বছর প্রচুর আখ চাষ হয়।

অর্থনৈতিক উপাদান (Economic elements)

১. মূলধন: চিনি শিল্পের জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন। সরকার এ শিল্পের প্রায় সব মূলধনই সরবরাহ করে থাকে।

২. শ্রমিক সরবরাহ: কারখানায় কাজ করার জন্য শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় সুলভে বহু শ্রমিক পাওয়া যায়।

৩. পরিবহন ব্যবস্থা: কারখানাগুলোতে আখ সংগ্রহ' এবং বিভিন্ন বাজারে চিনি প্রেরণের জন্য সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থাও বাংলাদেশে বিদ্যমান।

৪. বাজার: বাংলাদেশে সর্বত্র চিনির চাহিদা ব্যাপক। ফলে কলগুলোতে উৎপন্ন চিনি বাজারজাত করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

সাংস্কৃতিক উপাদান (Cultural elements)

১. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে চিনি শিল্পের প্রসার ঘটিয়েছে।

২. রাজনৈতিক নিশ্চয়তা: অনেক সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে চিনি শিল্প বাধার সম্মুখীন হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে চিনি শিল্পের ক্ষেত্রে এরূপ দেখা যায় না।

খ. বাংলাদেশের চিনি শিল্পের উৎপাদন: স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে চিনি শিল্পের উৎপাদন খুবই কম ছিল। কারণ বেশির ভাগ চিনি শিল্প কারখানা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত চিনির উৎপাদন বিভিন্নভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সারণি-৬.৪: চিনির উৎপাদন ও বৃদ্ধির হার (মেট্রিক টন)

সালউৎপাদনের পরিমাণহ্রাস-বৃদ্ধির হার (%)
২০১৩-১৪১২৮,২৬৭(+) ১৬.৫০
২০১৪-১৫৭৮,৯০৪(-) ৬২.৫৬
২০১৫-১৬৫৮,১৫১(-) ৩৫.৬৯
২০১৬-১৭৫৯,৯৮৪(+) ৩.০৬
২০১৭-১৮৬৮,৬০৩(+) ১.১৪

উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯, পৃষ্ঠা ২৪৮

বাংলাদেশে বছরওয়ারি চিনি উৎপাদন কম-বেশি হয়ে থাকে। বিভিন্ন আর্থসামাজিক কারণ এর পিছনে ক্রিয়াশীল। ২০১৩-২০১৪ সালে ১২৮,২৬৭ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়, যা ২০১৪-২০১৫ সালে হ্রাস পেয়ে ৭৮,৯০৪ মেট্রিক টনে নেমে আসে। আবার ২০১৫-২০১৬ সালে চিনির উৎপাদন হয় ৫৮,১৫১ মেট্রিক টন, যা ২০১৭-২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮,৬০৩ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। এরূপ অস্থিতিশীল (হ্রাস-বৃদ্ধি) ধারা আজও বর্তমান। উপরের সারণিতে তা দেখানো হয়েছে।

গ. চিনি শিল্পের বণ্টন: সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এ চিনিকলগুলো ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে অবস্থিত। ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালে কোনো চিনিকল গড়ে উঠেনি। নিচে বিভাগ অনুসারে চিনি শিল্পের বণ্টন দেখানো হলো-

১. রাজশাহী বিভাগ: দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৫টি এ বিভাগে গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের চিনিকলগুলো হলো জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস।
২. রংপুর বিভাগ: এ বিভাগে মোট ৫টি চিনিকল রয়েছে। সেগুলো হলো পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ এবং রংপুর সুগার মিলস।
৩. খুলনা বিভাগ: এ অঞ্চলে মাত্র ৩টি চিনিকল গড়ে উঠেছে। এগুলো হলো কুষ্টিয়ার জগতি, কেরু এন্ড কোং ও মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস। তবে এসব চিনিকলের মধ্যে দর্শনার কেরু এন্ড কোম্পানি চিনি কলটি বেসরকারি খাতে নির্মিত। ১৯৩৮ সালে ব্যক্তিমালিকানায় নির্মিত এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭২ সালে জা'য়করণ করা হয়। এখানে চিনি ছাড়াও অ্যালকোহল, স্পিরিট প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।

৪.ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ: ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নিয়ামকসমূহ আখ চাষের অনুকূল হওয়ায় এ অঞ্চলে প্রচুর আখ জন্মে। এ বিভাগ দুটিতে একটি করে চিনি কল আছে। এ কলগুলো হলো ফরিদপুর সুগার মিলস এবং জামালপুরের ঝিল বাংলা চিনিকল।

ঘ. চিনি শিল্পের বাণিজ্য: আখের অভাবে বাংলাদেশের চিনি কলগুলোতে ক্ষমতা অনুযায়ী চিনি উৎপাদিত হয় না। বর্তমানে দেশের চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৪ লক্ষ মেট্রিক টন। যেখানে দেশের ১৫টি চিনিকলের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক প্রায় ২.১০ লক্ষ মেট্রিক টন মাত্র। দেশে চিনির প্রকৃত চাহিদার তুলনায় সরকার নিয়ন্ত্রনাধীন চিনিকলগুলোতে চিনির উৎপাদন খুবই সামান্য। ফলে বেসরকারি খাতে স্থাপিত ৫/৬টি সুগার রিফাইনারিতে উৎপাদিত চিনি এবং আমদানিকৃত চিনি দ্বারা দেশের ঘাটতি পূরণ করা হয়। দেশের চাহিদা

মেটানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার কিউবা, ব্রাজিল, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ হতে প্রচুর চিনি আমদানি করে থাকে। (সূত্র- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৯)

সারণি-৬.৫: বাংলাদেশের চিনি আমদানি

সালপরিমাণ (হাজার মেট্রিক টন)
২০১৫১৯৮২
২০১৬২২৮৩
২০১৭২০৯৭
২০১৮২৬৫৪
২০১৯২৪৫৫

Source: United States Department of Agriculture, 2020

ঙ. বাংলাদেশের চিনি শিল্পের সমস্যা: বাংলাদেশের চিনি শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হলেও বিশেষ কতগুলো সমস্যা এ শিল্প প্রসারে বাধার সৃষ্টি করছে। যেমন-

১. চিনিকলগুলোর চাহিদার তুলনায় আখের উৎপাদন অনেক কম। বাংলাদেশের আখ উৎপাদনের মৌসুম মাত্র ৪-৫ মাস। ফলে চিনি কলগুলো বছরের প্রায় ৫-৬ মাস বন্ধ থাকে। কল বন্ধ থাকাকালীন শ্রমিকদের বেতন বহন করতে হয় বলে চিনির উৎপাদন খরচ অধিক হয়।
২. কোনো কোনো চিনিকল (ফরিদপুর সুগার মিলস) আখ উৎপাদন অঞ্চল থেকে দূরে অবস্থান করায় পরিবহন ব্যয় বেশি হয়।
৩. কৃষকেরা উৎপাদিত আখের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পায় না বলে চিনিকলের নিকটবর্তী অঞ্চলে গুড় তৈরির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চিনির কলগুলোতে আখ সঙ্কট দেখা দেয়।
৪. এছাড়াও দেশে বিরাজমান লোডশেডিং এর কারণে উৎপাদন হ্রাস পায় এবং মূল্য বৃদ্ধি পায়।

চ. চিনি শিল্পের সম্ভাবনা: বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ লক্ষ টন চিনির প্রয়োজন। কিন্তু আখের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। তাই এ শিল্পের উন্নতিকল্পে নিচে বর্ণিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন-
১. চিনি শিল্পের উন্নতির জন্য আখের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
২. চিনিকলের নিকটবর্তী অঞ্চলে আখ চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. একর প্রতি উৎপাদনের পরিমাণ কম হওয়ায় আখ বলয় হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় অনেক বেশি জমি আখ চাষের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কৃষকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।
৪. চিনি কলগুলোতে আখ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রুতগামী পরিবহন ও রাস্তাঘাটের সুব্যবস্থা করতে হবে।
৫. উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ ও চারা ব্যবহার করে আখ চাষ করতে হবে। এর ফলে আখ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
৬. আখের রস নিষ্কাশনে ও চিনি পরিশোধনের আধুনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।

তাই বলা যায়, বাংলাদেশে চিনি শিল্প গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চিনি শিল্পে বিরাজমান সমস্যাবলি চিহ্নিত করে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রদান ও তাদের আখ চাষে অনুপ্রাণিত করতে পারলে দেশে আখ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে চিনি কলগুলোতে প্রচুর চিনি উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে করে বিদেশ থেকে চিনি আমদানি কমে আসবে ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করাও সম্ভব হবে। তাই উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে বাংলাদেশে চিনি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...