(Cement Industry)
১৯৭১ সালের পূর্বে এদেশে সিমেন্ট শিল্প তেমন বিকাশ লাভ করেনি। তখন মূলত ছাতকেই কেবল সিমেন্ট উৎপাদিত হতো। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে এই শিল্প প্রসার লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে দেশীয় সিমেন্ট শিল্প কারখানার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মাল্টি ন্যাশনাল সিমেন্ট কোম্পানি যেমন- হোলসিম, হাইডেলবার্গ, লাফাজ সুরমা, সিমেক্স ইত্যাদি এ শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সিমেন্ট শিল্প গড়ে ওঠার কারণ: সিমেন্ট শিল্প গড়ে উঠতে কাদামাটি, চুনাপাথর ইত্যাদি কাঁচামালের প্রয়োজন। এ কারণে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলগুলোতে সিমেন্ট কারখানা বেশি গড়ে উঠেছে। তবে জিপসাম, ক্লিংকার, ফ্লাইঅ্যাশ ইত্যাদি আমদানি করে এসব কারখানায় সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়।
বাংলাদেশে সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন: বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন তেমন বৃদ্ধি পায়নি। তবে ৯০ এর দশকের পর থেকে এদেশে অবকাঠামোর উন্নয়ন ও নতুন নতুন ভবন তৈরির জন্য সিমেন্ট উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সারণি-৬.৬: বাংলাদেশের সিমেন্ট উৎপাদন (মেট্রিক টন)
| সাল | উৎপাদন |
| ২০১৩-২০১৪ | ৩,৫৬৯,৬০৮ |
| ২০১৪-২০১৫ | ৫,৭৭০,৫২৭ |
| ২০১৫-২০১৬ | ৮,৭৫৪,৬৪১ |
| ২০১৬-২০১৭ | ১২,৭৭৫,৯৬৭ |
| ২০১৭-২০১৮ | ১৪,৬৮৯,৭৮০ |
| ২০১৮-২০১৯ | ৩১,৩০০,০০০ |
উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯, পৃষ্ঠা-২৪৮
বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের বণ্টন: বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৮টি সিমেন্ট কারখানায় মধ্যে ৩৪টি কারখানায় সিমেন্ট উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন জেলাতে এ কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে। নিচে বিভাগ অনুসারে সিমেন্ট শিল্পের বণ্টন দেখানো হলো-
১. চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রাম বিভাগে অনুকূল পরিবেশের জন্য কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিমেন্ট কারখানা ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারখানার বার্ষিক সিমেন্ট উৎপাদনের পরিমাণ ৬ লক্ষ মেট্রিক টনের উপরে। চট্টগ্রাম বিভাগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো কনফিডেন্স সিমেন্ট কারখানা। এটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সীতাকুণ্ডে অবস্থিত।
২. খুলনা বিভাগ: এই বিভাগে খুলনা জেলার মংলা বন্দরের নিকট মেঘনা সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। এটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারখানায় অন্যান্য উপাদানের সাথে বিদেশ থেকে খণ্ডপাথর আমদানি করে সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়। এছাড়া মংলা সিমেন্ট কারখানা হতে বছরে প্রায় ৫ লক্ষ মেট্রিক টন সিমেন্ট উৎপাদিত হয়। এটাও ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া ১.৮ লক্ষ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সিমেন্ট কারখানা যশোরে নির্মিত হয়েছে।
৩. ঢাকা বিভাগ: ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার মেঘনা ঘাটের নিকট হোলসিম (১লা মার্চ ২০১৮ এটি লাফার্জ-হোলসিম নামে একীভূত হয়) সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। এটি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ লক্ষ মেট্রিক টন। পরবর্তীতে এখানে আরও বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। যেমন: ফ্রেশ সিমেন্ট কারখানা। এছাড়া কুমিল্লার দাউদকান্দিতেও সিমেন্ট কারখানা রয়েছে।
৪. সিলেট বিভাগ: সিলেটের সুনামগঞ্জের ছাতকে ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাতক সিমেন্ট কারখানা। পূর্বে এই কারখানার নাম ছিল আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কারখানা। এই কারখানায় সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট, বাগলিবাজার, ভাঙ্গারহাট, চরগা, লালঘাট প্রভৃতি স্থানের চুনাপাথর ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সুনামগঞ্জের আইনপুরে প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন ক্ষমতা সম্পন্ন ছোট আকৃতির আরেকটি সিমেন্ট কারখানা রয়েছে।
৫.রংপুর বিভাগ: রংপুর বিভাগের জয়পুরহাট সিমেন্ট কারখানাটিতে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭ লক্ষ মেট্রিক টন। এতে স্থানীয় চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়।

সিমেন্ট শিল্পের বাণিজ্য: বাংলাদেশ, কয়েক বছর পূর্বেও সিমেন্ট উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না। ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিশ্ব বাজার হতে সিমেন্ট ক্রয় করতে হতো। বর্তমানে বাংলাদেশ সিমেন্ট শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল সিমেন্ট এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সিমেন্টের বাজার রয়েছে। ২০১৮ সালে ৩ কোটি ১৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ডলার সমমূল্যের সিমেন্ট রপ্তানি করেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে সিমেন্ট রপ্তানি করছে।
সিমেন্ট শিল্পের সমস্যা: বাংলাদেশের সিমেন্ট অগ্রসরমান শিল্প হলেও এর বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।
১. কাঁচামালের আমদানির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়;
২. পুরাতন যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও এগুলো সংস্কারের ঘাটতি রয়েছে;
৩. বাজারজাতকরণ ও শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টার ঘাটতি রয়েছে;
৪. বিদ্যুতের লোডশেডিং এর ফলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়;
৫. পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব;
৬. বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ।
সিমেন্ট শিল্পের সমস্যার সমাধান: নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গৃহীত হলে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের বাধাসমূহ কাটিয়ে
অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ শিল্প ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হবে-
১. সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল সুলভে আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে;
২. কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে উৎপাদন বাড়াতে হবে;
৩. শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা আনয়ন করতে হবে;
৪. শ্রমিক অসন্তোষ যাতে না ঘটে সে জন্য শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে;
৫. বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে;
৬. অভ্যন্তরীণ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে;
৭. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে হবে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more