সমভূমি (পাঠ-৬)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

2

(Plains)

প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ সমতল ভূভাগকে সমভূমি বলা হয়। এটি সাধারণত সমুদ্র সমতলের চেয়ে সামান্য উঁচু হয় তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েকশ মিটার উঁচুও হয়ে থাকে। যেমন: কানাডার দক্ষিণ আলবার্টা। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে সমভূমি এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০% এরও বেশি লোক সমভূমি অঞ্চলে বাস করে।

সমভূমির বৈশিষ্ট্য: সমভূমির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন: এটি কখনও খাড়া ঢালবিশিষ্ট হয় না; অবস্থানের দিক থেকে কোনো বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না; যেমন: কোনো কোনো সমভূমি মহাদেশের সীমান্তে মহাসাগরের তীরে (গাজোয় সমভূমি) অবস্থিত; আবার কোনো কোনো সমভূমি (তুর্কিস্তানের সমভূমি) মহাদেশীয় ভূভাগের একেবারে অভ্যন্তরে অবস্থিত।
সমভূমির শ্রেণিবিন্যাস ও বিবরণসমভূমি প্রধানত তিন প্রকার। যথা-

১. সঞ্চয়জাত সমভূমি (Depositional plains);
২. ক্ষয়জাত সমভূমি (Residual plains); এবং
৩. ভূআন্দোলনের ফলে গঠিত সমভূমি (Tectonic plains)।

১. সঞ্চয়জাত সমভূমি: নদী, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি শক্তি দ্বারা ক্ষয়ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি কোনো নিম্নভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত হয়ে সঞ্চয়জাত সমভূমির সৃষ্টি করে। আবার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উৎক্ষিপ্ত লাভা ও ভস্ম কোনো নিম্নভূমিতে সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকেও সঞ্চয়জাত সমভূমি বলে। সঞ্চয়জাত সমভূমিকে আবার নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

ক. পলল পাখা: পর্বত বা পাহাড়ের পাদদেশে বা নিম্ন ঢালে নদী দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে পাখা সদৃশ যে ভূভাগ গড়ে তোলে তাকে পলল পাখা (alluvial fan) বলা হয়। যেমন- ভারতের উত্তর প্রদেশের তরাই অঞ্চল।

খ. প্লাবন সমভূমি: নদীর উভয় তীরে বন্যার পানির দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে প্লাবন সমভূমি বলে। যেমন- যমুনার প্লাবন সমভূমি।

গ. বদ্বীপ (Delta): নদী মোহনায় পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তা মাত্রাহীন বাংলা 'Δ' বা গ্রীক (ডেন্টা) অক্ষরের ন্যায় বলে একে বদ্বীপ সমভূমি বলে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, নীল, মিসিসিপি প্রভৃতি নদীর মোহনায় বদ্বীপ সমভূমি রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত গাঙ্গেয় অঞ্চল বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ।

ঘ. লোয়েস সমভূমি: বায়ু দ্বারা বাহিত ধূলিকণা নির্দিষ্ট স্থানে সঞ্চিত হওয়ার ফলে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে লোয়েস সমভূমি বলে। যেমন- চীনের হোয়াংহো অববাহিকায় গঠিত লোয়েস সমভূমি।

৫. হ্রদ সমভূমি: নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি কোনো হ্রদে পতিত হলে কালক্রমে উক্ত হ্রদ ভরাট হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে হ্রদ সমভূমি বলে। যেমন- আমেরিকার ইরি হ্রদের দক্ষিণ তীরবর্তী সমভূমি।

চ. লাভা সমভূমি: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের লাভা সঞ্চয়ের ফলে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে লাভা সমভূমি বলে। ভারতের দাক্ষিণাত্যের উত্তরাংশের কিছু অংশ এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

ছ. হিমবাহ সমভূমি: হিমবাহ স্থলভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় যখন সম্পূর্ণভাবে গলে যায় তখন বাহিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয়, তাকে হিমবাহ সমভূমি বলে। কানাডা ও ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে অনেক হিমবাহ সমভূমি দেখা যায়। যেমন- উত্তর আমেরিকার প্রেইরি সমভূমি

জ. পর্বত পাদদেশীয় সমভূমি: প্রাথমিক পর্যায়েচ বাহিত নুড়ি, কাকর, বালি প্রভৃতি নদী দ্বারা অবক্ষেপণের ফলে পর্বতের পাদদেশে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে পর্বত পাদদেশীয় সমভূমি বলে। যেমন- রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ এলাকাই পাদদেশীয় সমভূমির অন্তর্ভুক্ত।

২. ক্ষয়জাত সমভূমি: রোদ, বৃষ্টি, বায়ুপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির কারণে কোনো উচ্চভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকে ক্ষয়জাত সমভূমি বলে। এরূপ সমভূমিকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. সমপ্রায় ভূমি নদীর ক্ষয়কাজের ফলে উচ্চভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্রমশ সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়। যেমন-ফিনল্যান্ড।.

.

খ. পেনিপ্লেন: শুষ্ক ও শুষ্কপ্রায় এলাকাগুলোতে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবনের ফলে পাহাড়ের ঢালগুলো ক্ষয়ীভূত হয়ে স্বাভাবিক ঢালবিশিষ্ট যে ভূভাগ সৃষ্টি করে তাকে পেনিপ্লেন বলে। উদাহরণ: কানাডার Belcher Inlands.

গ. মরু সমভূমি: মরু অঞ্চলের বায়ু বালুকারাশি উড়িয়ে নিয়ে যে প্রস্তরময় সমপ্রায় ভূমির সৃষ্টি করে তাকে মরু সমভূমি বলে। যেমন- সাহারার হামাদা, লিবিয়ার মেরি, আলজেরিয়ার রেগ।

ঘ. হিমবাহ ক্ষয়জাত সমভূমি: পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ঘর্ষণে অসমতল ভূভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন সমতল ভূভাগে পরিণত হয়। যেমন- কানাডার শিল্ড এ জাতীয় সমভূমি।

৬. নদীর ক্ষয়জাত সমভূমি: পানি স্রোতের ক্ষয়কাজের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষয়িত সমভূমি গঠিত হয়।
উদাহরণ: ক্যালিফোর্নিয়ার রেড রক ক্যানিয়ন।

৩. ভূআলোড়নজাত সমভূমি: ভূআলোড়নের প্রভাবে ভূত্বকের দুর্বল স্থানে, বিশেষ করে মহাদেশীয় প্রান্তভাগ, মহীসোপান কিংবা মহীঢাল উত্থিত হয়ে এবং মহাদেশের অভ্যন্তরে নিচু ভূমি উত্থিত হয়ে সমভূমি গঠন করে। নিম্নলিখিত ভূমিরূপগুলো ভূআলোড়নের প্রভাবে উৎপত্তি লাভ করেছে।

ক. উন্নত সমভূমি: ভূমিকম্পের ফলে ভূপৃষ্ঠের নিম্নভূমি উঁচু হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে তাকে উন্নত সমভূমি * বলে। যেমন- ইউরেশিয়ার স্টেপ অঞ্চল এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

খ. অবনত সমভূমি: ভূমিকম্পের ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো উঁচু স্থান বসে গিয়ে যে নিম্নভূমির সৃষ্টি করে তাকে অবনত সমভূমি বলে। যেমন- তুরানের নিম্নসমভূমি।

গ. ভূগাঠনিক সমভূমি: যেখানে ভূত্বকের শিলাস্তর প্রায় সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত, প্রাকৃতিক কারণেই সেখানে সমভূমি গঠিত হয়। যেমন- সোভিয়েত ইউনিয়নের উচ্চভূমি।

ঘ. উপকূলীয় সমভূমি বা সৈকত সমভূমি: ভূগর্ভের উচ্চ চাপের ফলে সৃষ্ট ভূআলোড়নের প্রভাবে মহীসোপান বা মহীঢাল ধীরে ধীরে উত্থিত হয়ে সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় সৈকত সমভূমির সৃষ্টি করে। যেমন- ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার সৈকত সমভূমি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

পৃথিবীর গঠন - প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...