> পাঠ-১: সমুদ্রস্রোতের কারণ

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Causes of Ocean Current)

পানির স্বাভাবিক ধর্মই হলো এর উপরিভাগের তাপমাত্রার সমতা রক্ষা করা। সমুদ্রপৃষ্ঠে মূলত তাপমাত্রার সমতা রক্ষার জন্য পানিরাশির কিছুটা অংশ এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয় যা সমুদ্রস্রোত নামে পরিচিত। উত্তাপের তারতম্য অনুসারে সমুদ্রস্রোত দুই প্রকার। যথাঃ উষ্ণস্রোত (warm current) ও শীতল স্রোত (cold current)।
নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি হয়।

১. বায়ুপ্রবাহ; ২. পৃথিবীর আবর্তন; ৩. লবণাক্ততার তারতম্য; ৪. উষ্ণতার তারতম্য; ৫. বাষ্পীভবনের তারতম্য; ৬.
ভূভাগের অবস্থান; ৭. শৈলশিরার অবস্থান; ৮. সমুদ্রের গভীরতা প্রভৃতি।\

১. বায়ুপ্রবাহ (Wind movement): সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ বায়ুপ্রবাহ। মহাসাগরগুলোর উপরিভাগের
পানিরাশি বায়ু দ্বারা তাড়িত হয়ে এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর নিয়ত বায়ুপ্রবাহ নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। সমুদ্রস্রোত এ বায়ুর গতিপথ অনুসরণ করে। অয়ন বায়ু প্রবাহিত এলাকায় সমুদ্রস্রোত বায়ুপ্রবাহের গতির সাথে সঙ্গতি রেখে পূর্ব হতে পশ্চিমে এবং প্রত্যয়ন বায়ু প্রবাহিত এলাকায় পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে ধাবিত হয়। যেমন- আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর ও দক্ষিণ-নিরক্ষীয় স্রোত।

২. পৃথিবীর আবর্তন (Rotation of the earth): পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়।
এ আবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। ফেরেলের সূত্রানুসারে বায়ুপ্রবাহের মতো সমুদ্রস্রোতও উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। যেমন: উত্তর গোলার্ধে উপসাগরীয় স্রোত ও ক্যানারী স্রোতের প্রবাহ ঘড়ির কাটার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ব্রাজিল স্রোত ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়।

৩. লবণাক্ততার তারতম্য (Variation of salinity): মহাসাগরগুলোর অধিক লবণাক্ত পানি কম লবণাক্ত পানি অপেক্ষা ঘন ও ভারি। এ জন্য চাপও বেশি। ফলে লবণাক্ত ভারি পানি নিচের দিকে নেমে যায়। অন্যদিকে, কম লবণাক্ত হালকা পানি ওপরের দিকে ভেসে উঠে। এভাবে লবণাক্ততার সমতা রক্ষা করার জন্য পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। যেমন- কাস্পিয়ান সাগরের স্রোত।

৪. উষ্ণতার তারতম্য (Variation of temperature): নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানে মহাসাগরের পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত, হালকা এবং ঘনত্ব কমে যাওয়ায় সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশে অবস্থান করে। অপরদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে উত্তপ্ত পানি পৃষ্ঠস্রোত হিসেবে মেরু অঞ্চলের দিকে এবং মেরু অঞ্চলের ভারি পানি অন্তঃস্রোত হিসেবে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরে এ ধরনের স্রোত দেখা যায়।

৫. বাষ্পীভবনের তারতম্য (Variation of evaporation): নিরক্ষীয় অঞ্চলে অধিক বাষ্পীভবন হওয়ায় সেখানে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। ফলে কম বাষ্পীভবন হতে শীতল পানি অধিক বাষ্পীভবনের অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। সাধারণত স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত সাগরগুলোতে এ ধরনের সমুদ্রস্রোত দেখা যায়।

৬. ভূভাগের অবস্থান (Presence of landmasses): ভূভাগের অবস্থান সমুদ্রস্রোত সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। তবে ভূভাগের অবস্থানের ফলে একটি মূল স্রোত হতে একাধিক স্রোতের জন্ম হয়। যেমন: আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতটি দক্ষিণ আমেরিকার সেন্টরক 'অন্তরীপে বাধা পেয়ে দক্ষিণে বেঁকে গিয়ে ব্রাজিল স্রোতের সৃষ্টি করে।

৭. শৈলশিরার অবস্থান (Presence of ridges) : সমুদ্রের তলদেশে শৈলশিরার অবস্থানের ফলে শৈলশিরার উভয়পাশের তলদেশে পানির লবণাক্ততা, ঘনত্ব ইত্যাদির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ঘটে, যা পৃষ্ঠস্রোতের গতিপ্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন: আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল ও জিব্রাল্টার প্রণালির মধ্যভাগে একটি শৈলশিরা থাকায় আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শীতল স্রোত ভূ-মধ্যসাগরে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

৮. সমুদ্রের গভীরতা (Depth of ocean): সূর্যের কিরণ সমুদ্রতলদেশে ২১০ মিটারের বেশি প্রবেশ করতে পারে না। এ
কারণে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের পানির উষ্ণতার পার্থক্য ঘটে। তাছাড়া গভীরতম অংশগুলো পৃথিবীর কেন্দ্রের নিকটবর্তী বলে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিবিধ কারণে সমুদ্রের গভীরতম অংশগুলো সমুদ্রস্রোত সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একক কোনো কারণে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি হয় না। বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর আবর্তন ইত্যাদির সাথে লবণাক্ততা, উষ্ণতার প্রভাবে চাপের সমতা রক্ষা করার জন্য সমুদ্রের পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে নিয়মিত প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। সমুদ্রস্রোত একদিকে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে তেমনি মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...