hsc

ভূমিকম্পের ফলাফল (পাঠ-৪)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Consequence of Earthquake)

ভূমিকম্পের ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। আর কোনো প্রাকৃতিক শক্তি এত অল্প সময়ে জানমাল এবং প্রকৃতির এত বেশি ক্ষতি করতে পারে না। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের এবং জানমালের যে ক্ষতি সাধিত হয় তা নিচে দেওয়া হলো-

i. ভূমিকম্পের ফলে ভূত্বকে অনেক ফাটল ও চ্যুতির সৃষ্টি হয়। এ ফাটল ও চ্যুতির মধ্য দিয়ে উষ্ণ পানি, কর্দম, বালি প্রভৃতি নির্গত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। এছাড়া চ্যুতি সৃষ্টিকালে মধ্যবর্তী ভূভাগ বসে গিয়ে গ্রস্ত উপত্যকা এবং উপরে উত্থিত হয়ে স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে।

ii. ভূমিকম্পের ফলে কখনো কখনো সমুদ্রতল উপরে ভেসে উঠে আবার কখনও কখনও উপকূলভাগ সমুদ্রতলে ডুবে যায়। যেমন: ১৯২৩ সালের ভূমিকম্পে জাপানের সাগামী উপসাগরের অংশবিশেষ ২১৫ মিটার উপরে উঠে যায়।

iii. ভূমিকম্পের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় বা 1 নদীতল উপরে উঠে শুকিয়ে যায়। ১৯৫০ সালে আসামের দিবং নদীর গতি এভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। ১৮৮৭ সালে এক ভূমিকম্পে আমাদের দেশের ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। পরবর্তীতে তা যমুনা নামে নতুন পথে প্রবাহিত হচ্ছে।

iv. ভূমিকম্পের ফলে কখনও উচ্চভূমি সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয় আবার সমুদ্রের তলদেশের কোনো কোনো স্থান উঁচু হয়ে দ্বীপের সৃষ্টি করে। ১৮৯৯ সালের ভূমিকম্পে কচ্ছ উপসাগরের উপকূলের প্রায় ৫,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যায়।

ভূমিকম্প কীভাবে পরিমাপ করা হয়?

আমেরিকান বিজ্ঞানী সি. আর রিখটার ১৯৩৫ সালে ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ণয়ের জন্য যে স্কেল প্রবর্তন করেন, তা রিখটার স্কেল হিসেবে খ্যাত। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মান নিম্নরূপ-

ক্রম নংরিখটার স্কেল মানতীব্রতার মাত্রাক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
১.৩ এর কমঅতি মৃদুকেবল যন্ত্রে ধরা পড়বে।
২.৩-৩.৯মৃদুযন্ত্রে ধরা পড়বে। মৃদু বোঝা যাবে।
৩.৪-৪.৯হালকাদরজা-জানালায় কাপুনি। পানিতে আলোড়ন।
৫-৫.৯মধ্যমদেওয়ালে ফাটল, জনমনে আতঙ্ক। স্বল্প ক্ষয়ক্ষতি।
৫.৬-৬.৯শক্তিশালীভূমিধ্বস, কাঁচা বাড়ি ধ্বংস, দালানে ফাটল।
৬.৭-৭.৯প্রবলভূমিধ্বস, পাকা দালানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ভূমিতে ফাটল, হিমানী সম্প্রপাত।
৭.+ভয়াবহজনপদ বিধ্বস্ত। ব্যাপক সম্পদ ও প্রাণহানি। ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি।

v. ভূমিকম্পের প্রবল ঝাঁকুনিতে ভূপৃষ্ঠে আনুভূমিক পার্শ্বচাপের প্রভাব পড়ে। ফলে এটি কুঁচকে ভাঁজের সৃষ্টি করে। (হিমালয় পর্বতমালায় এরূপ ভাজ দেখা যায়)।
vi. ভূমিকম্পের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে হিমানী সম্প্রপাত হয়। আল্পস পার্বত্য অঞ্চলে এরূপ দেখা যায়।

vii. ভূমিকম্পের ফলে উঁচু পর্বত থেকে শিল্যাচ্যুতি বা পাহাড়ে ভূমিধস ঘটে।
viii. ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রের পানি তীর থেকে অনেক নিচে নেমে যায়। আবার পরক্ষণেই ভীষণ গর্জন সহকারে ১৫-২০ ফুট উঁচু হয়ে উপকূল ভাগে বন্যার সৃষ্টি হয়। গভীর সমুদ্র বা মহাসাগরে ভূমিকম্প সংঘটিত হলে তথায় ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।
একে জাপানি ভাষায় সুনামি প্রবাহ বলে। ২০০৪ সালের সুনামিতে ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
ix. ভূমিকম্পের ফলে অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা ও জীবজন্তুর ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। ১৯৮৮ সালের ৭ডিসেম্বর রাশিয়ার আর্মেনিয়াতে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক মাটির নিচে চাপা পড়ে এবং চার লক্ষাধিক লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা: ভূঅভ্যন্তরের যে স্থানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় তাকে কেন্দ্র বলে। কেন্দ্রের সোজা ওপরে ভূপৃষ্ঠস্থ বিন্দুর নাম উপকেন্দ্র। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূঅভ্যন্তরের প্রায় ০৫-১১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুযায়ী পৃথিবীর একপ্রান্তে অবস্থিত ভূকম্পনকেন্দ্র হতে সৃষ্ট তরঙ্গমালা পৃথিবীর অপরপ্রান্ত পর্যন্ত পৌছাতে পারে। অবশ্য কেন্দ্র হতে তরঙ্গগুলো যতই দূরে অগ্রসর হয় ততই নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল: পৃথিবীর সর্বত্র ভূমিকম্পের প্রকোপ সমান নয়। বেশিরভাগ ভূমিকম্প (প্রায় ৯৫%)
পৃথিবীর অল্পস্থান জুড়ে হয়ে থাকে, যা আয়তনে দীর্ঘ ও সরু। পৃথিবীর বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা (যেমনঃ জাপান, ফিলিপাইন), নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা, আগ্নেয় মেখলা অঞ্চল ও সামুদ্রিক শৈলশিরাসমূহে অধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোকে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়।

ক. প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটের বহিঃসীমানা বরাবর ভূমিকম্প প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
এখানে আগ্নেয়গিরিগুলো এ মহাসাগরকে মালার মতো বেষ্টন করে আছে বলে এ অঞ্চলকে আগ্নেয় মেখলা (Rings of Fire) বলা হয়ে থাকে। এ অঞ্চলের জাপান, ফিলিপাইন, চিলি, অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং আলাস্কা প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। পৃথিবীর অধিক ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানও এ অঞ্চলে অবস্থিত। এদেশে বার্ষিক প্রায় ৭,৫০০ টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে অগভীর, মাঝারি ও গভীর কেন্দ্র বিশিষ্ট ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।

খ. ভূমধ্যসাগরীয় হিমালয় অঞ্চল : আল্পস পর্বত থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের উত্তর তীর হয়ে ককেশাস, ইরান
মালভূমি, হিমালয় পর্বতমালা, ইন্দোচীন ও পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ হয়ে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এ অঞ্চলটি বিস্তৃত। অগভীর ও মাঝারি গভীরতার কেন্দ্র বিশিষ্ট ভূমিকম্প এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ইতালি এ অঞ্চলে অবস্থিত। এদেশে বার্ষিক প্রায় ৫০০টি ভূমিকম্প সংঘটিত হলো এটাকে l

গ. মধ্য আটলান্টিক-ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা অঞ্চল: উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা এবং ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরার সাথে মিলে এ অঞ্চলটি লোহিত সাগর বরাবর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাথে মিশেছে। এ সমস্ত গভীর ভূমিকম্পকেন্দ্রের বেশিরভাগ স্বাভাবিক চ্যুতি বরাবর অবস্থিত।

পৃথিবীর মধ্যে কোথাও এমন একবিন্দু স্থান নেই যা ভূমিকম্পের প্রভাব হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। পৃথিবীর প্রায় ৫০ ভাগ ভূমিকম্পপ্রবণ কেন্দ্র নবীন ভঙ্গিল পাবর্ত্য এলাকায় অবস্থিত। শতকরা ৪০ ভাগ অপেক্ষাকৃত খাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং অবশিষ্ট ১০ ভাগ পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া সমুদ্রের তলদেশেও বহু ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল বিদ্যমান রয়েছে।

বিশ্বের কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প১৮৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চীনে ভূমিকম্পের রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে পৃথিবীর সর্বত্র ভূমিকম্পের রেকর্ড খুব প্রাচীন নয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প বর্ণিত হলো- বিংশ শতাব্দীর পূর্বে

১. ১৫১১ সালে বার্নিওলা ভূমিকম্পে পূর্ব ইউরোপের স্লোভানিয়ার দু'টি শহর বিধ্বস্ত হয়।
২. ১৫৫৬ সালে চীনে শানসি প্রদেশের ভূমিকম্পে ৮,৩০,০০০ ব্যক্তি প্রাণ হারায়।
৩. ১৬৬৭ সালে ক্রোয়েশিয়ার ডুবরোভনিকে দুই তৃতীয়াংশ ভাগ জনগণ প্রাণ হারায়।
৪. ১৬৯৩ সালে গ্রেট সিসিলিয়ান ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারায়।
৫. ১৭৫৫ সালে লিসবন ভূমিকম্প নামে পরিচিত ভূমিকম্পজনিত সুনামিতে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপসমূহে ৬০,০০০-১,০০,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৬. ১৭৮৩ সালে ইতালির কালাব্রিয়াতে পর পর ছয়টি ভূমিকম্পে ৫০,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৭. ১৮১১ সালে নিউ মাদ্রিদ বলে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী শহর ভূমিকম্পে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং মিসিসিপি নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়।
৮ ১৮৮৭ সালে আসামে ভমিকম্পে হাজার হাজার প্রাণহানি ছাড়াও ব্যাপক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়

বিংশ শতাব্দী

১. ১৯০৬ সালে সানফ্রানসিসকো শহরে ভূমিকম্পে ৩,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটলেও সম্পদহানির পরিমাণ ছিল ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
২. ১৯২৩ সালে হনসু দ্বীপের ভূমিকম্পে জাপানের টোকিও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১,৪০,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৩.. ১৯৬০ সালে গ্রেট চিলি ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যপ্তি লাভ করে এবং ৫,৭০০ লোকের প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটায়।
৪. ১৯৭০ সালে পেরুতে ভূমিকম্পে ইয়ানগে শহর ভূমিধসে চাপা পড়ে ৪০,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৫. ১৯৭২ সালে নিকারাগুয়ার মনোগুয়াতে ভূমিকম্প আঘাত হানলে ১০,০০০ লোক প্রাণ হারায় এবং শহরের ৯০% ধ্বংস হয়।
৬. ১৯৭৬ সালে চীনের তাংশান ভূমিকম্পে ২৫৫,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৭. ১৯৭৬ সালে গুয়েতমালায় ভূমিকম্পে ২৩,০০০ লোকের মৃত্যু এবং ২,৫০,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।
৮. ১৯৮৮ সালে আর্মেনিয়ার ভূমিকম্পে ২৫,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৯. ১৯৯০ সালে ইরানের জিলান ভূমিকম্পে ৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে।
১০. ১৯৯৩ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রে ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংস ছাড়াও ৪৫,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।

একবিংশ শতাব্দী
১. ২৬ জানুয়ারি, ২০০১ সালে গুজরাটে ২০,০০০ প্রাণহানি ঘটে; আহত হয় ১৬৭,০০০ জন। প্রায় চার লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।
২. ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৩ সালে ইরানের ব্যাম নগরে ভূমিকম্পে ২৬,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৩. ২১ মে, ২০০৩ সালে আলজেরিয়ায় ভূমিকম্পে ২,২৬৬ জন প্রাণ হারায়। ১২,২৪৩টি ভবন ধসে পড়ে।
৪. ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ভূমিকম্পের ফলে সুনামির সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় আড়াই লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
৫. ৮ অক্টোবর, ২০০৫ সালে কাশ্মীরে এক ভূমিকম্পে (পাকিস্তান অংশে) প্রায় ৮৭,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৬. ১২ মে, ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের ভূমিকম্পে ৬৯,০০০ প্রাণহানি ঘটে। ৪৮ লাখ লোক ঘরবাড়ি হারায়।
৭. ১২ জানুয়ারি, ২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পে ৩,১৬,০০০ জন মৃত্যুবরণ করে।
৮. ১৪ এপ্রিল, ২০১০ সালে চীনের উশু, কিংঘাই অঞ্চলে ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৯. ১১ মার্চ, ২০১১ সালে জাপানে এক ভূমিকম্পে প্রায় ১৬,০০০ মৃত্যুবরণ করে।
১০. ২৫ এপ্রিল, ২০১৫ সালে নেপালে সংঘটিত ভূমিকম্পে ৮,০০০ লোকের প্রাণহানির সাথে ১৮,০০০ জন আহত হয়।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...