hsc

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা (অষ্টম অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.5k

নিয়ত বায়ুপ্রবাহের মতো সমুদ্রস্রোতও একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে। সমুদ্রের একস্থান থেকে অন্যস্থানে পানির নির্দিষ্ট প্রবাহকে সমুদ্রস্রোত বলে। সমুদ্রতলও স্থির নয়। দিনে দুইবার নিয়মিত সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে এবং নিচে নেমে যায়। সমুদ্রের পানির উচ্চতার এ ক্রমবৃদ্ধি ও হ্রাসকে জোয়ার-ভাটা বলে।

সমুদ্রতলে তাপমাত্রার পার্থক্যের দরুন শীতল ও উষ্ণ স্রোতের সৃষ্টি হয়। আবার তাপমাত্রাজনিত ঘনত্বের তারতম্য, সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্য ইত্যাদির কারণেও সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর আহ্নিকগতি ও মহাশূন্যের সকল বস্তুর মহাকর্ষ শক্তির কারণে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। জোয়ার-ভাটা সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব। ফেলে। এ অধ্যায়ে সমুদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণ এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের চিত্রগুলো লক্ষ করো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:
নিচের চিত্রটি লক্ষ্য করো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:
নিচের চিত্রটি লক্ষ করো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

(Causes of Ocean Current)

পানির স্বাভাবিক ধর্মই হলো এর উপরিভাগের তাপমাত্রার সমতা রক্ষা করা। সমুদ্রপৃষ্ঠে মূলত তাপমাত্রার সমতা রক্ষার জন্য পানিরাশির কিছুটা অংশ এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয় যা সমুদ্রস্রোত নামে পরিচিত। উত্তাপের তারতম্য অনুসারে সমুদ্রস্রোত দুই প্রকার। যথাঃ উষ্ণস্রোত (warm current) ও শীতল স্রোত (cold current)।
নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি হয়।

১. বায়ুপ্রবাহ; ২. পৃথিবীর আবর্তন; ৩. লবণাক্ততার তারতম্য; ৪. উষ্ণতার তারতম্য; ৫. বাষ্পীভবনের তারতম্য; ৬.
ভূভাগের অবস্থান; ৭. শৈলশিরার অবস্থান; ৮. সমুদ্রের গভীরতা প্রভৃতি।\

১. বায়ুপ্রবাহ (Wind movement): সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ বায়ুপ্রবাহ। মহাসাগরগুলোর উপরিভাগের
পানিরাশি বায়ু দ্বারা তাড়িত হয়ে এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর নিয়ত বায়ুপ্রবাহ নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। সমুদ্রস্রোত এ বায়ুর গতিপথ অনুসরণ করে। অয়ন বায়ু প্রবাহিত এলাকায় সমুদ্রস্রোত বায়ুপ্রবাহের গতির সাথে সঙ্গতি রেখে পূর্ব হতে পশ্চিমে এবং প্রত্যয়ন বায়ু প্রবাহিত এলাকায় পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে ধাবিত হয়। যেমন- আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর ও দক্ষিণ-নিরক্ষীয় স্রোত।

২. পৃথিবীর আবর্তন (Rotation of the earth): পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়।
এ আবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। ফেরেলের সূত্রানুসারে বায়ুপ্রবাহের মতো সমুদ্রস্রোতও উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। যেমন: উত্তর গোলার্ধে উপসাগরীয় স্রোত ও ক্যানারী স্রোতের প্রবাহ ঘড়ির কাটার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ব্রাজিল স্রোত ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়।

৩. লবণাক্ততার তারতম্য (Variation of salinity): মহাসাগরগুলোর অধিক লবণাক্ত পানি কম লবণাক্ত পানি অপেক্ষা ঘন ও ভারি। এ জন্য চাপও বেশি। ফলে লবণাক্ত ভারি পানি নিচের দিকে নেমে যায়। অন্যদিকে, কম লবণাক্ত হালকা পানি ওপরের দিকে ভেসে উঠে। এভাবে লবণাক্ততার সমতা রক্ষা করার জন্য পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। যেমন- কাস্পিয়ান সাগরের স্রোত।

৪. উষ্ণতার তারতম্য (Variation of temperature): নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানে মহাসাগরের পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত, হালকা এবং ঘনত্ব কমে যাওয়ায় সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশে অবস্থান করে। অপরদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে উত্তপ্ত পানি পৃষ্ঠস্রোত হিসেবে মেরু অঞ্চলের দিকে এবং মেরু অঞ্চলের ভারি পানি অন্তঃস্রোত হিসেবে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরে এ ধরনের স্রোত দেখা যায়।

৫. বাষ্পীভবনের তারতম্য (Variation of evaporation): নিরক্ষীয় অঞ্চলে অধিক বাষ্পীভবন হওয়ায় সেখানে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। ফলে কম বাষ্পীভবন হতে শীতল পানি অধিক বাষ্পীভবনের অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। সাধারণত স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত সাগরগুলোতে এ ধরনের সমুদ্রস্রোত দেখা যায়।

৬. ভূভাগের অবস্থান (Presence of landmasses): ভূভাগের অবস্থান সমুদ্রস্রোত সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। তবে ভূভাগের অবস্থানের ফলে একটি মূল স্রোত হতে একাধিক স্রোতের জন্ম হয়। যেমন: আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতটি দক্ষিণ আমেরিকার সেন্টরক 'অন্তরীপে বাধা পেয়ে দক্ষিণে বেঁকে গিয়ে ব্রাজিল স্রোতের সৃষ্টি করে।

৭. শৈলশিরার অবস্থান (Presence of ridges) : সমুদ্রের তলদেশে শৈলশিরার অবস্থানের ফলে শৈলশিরার উভয়পাশের তলদেশে পানির লবণাক্ততা, ঘনত্ব ইত্যাদির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ঘটে, যা পৃষ্ঠস্রোতের গতিপ্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন: আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল ও জিব্রাল্টার প্রণালির মধ্যভাগে একটি শৈলশিরা থাকায় আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শীতল স্রোত ভূ-মধ্যসাগরে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

৮. সমুদ্রের গভীরতা (Depth of ocean): সূর্যের কিরণ সমুদ্রতলদেশে ২১০ মিটারের বেশি প্রবেশ করতে পারে না। এ
কারণে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের পানির উষ্ণতার পার্থক্য ঘটে। তাছাড়া গভীরতম অংশগুলো পৃথিবীর কেন্দ্রের নিকটবর্তী বলে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিবিধ কারণে সমুদ্রের গভীরতম অংশগুলো সমুদ্রস্রোত সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একক কোনো কারণে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি হয় না। বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর আবর্তন ইত্যাদির সাথে লবণাক্ততা, উষ্ণতার প্রভাবে চাপের সমতা রক্ষা করার জন্য সমুদ্রের পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে নিয়মিত প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। সমুদ্রস্রোত একদিকে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর প্রকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে তেমনি মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Current of the Atlantic Ocean)

মহাসাগরগুলোতে সারাবছরব্যাপি সমুদ্রের পানি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয় যা সমুদ্রস্রোত নামে পরিচিত। প্রতিটি মহাসাগরে এই স্রোত সাধারণভাবে মহাসাগরগুলোর নামে চিহ্নিত হয়। যেমন- প্রশান্ত, ভারত, আটলান্টিক মহাসাগরীয় স্রোত ইত্যাদি।
আটলান্টিক মহাসাগরে দুটি স্রোতচক্র (cycle of currents) দেখা যায়। নিরক্ষরেখার উত্তরে উত্তর আটলান্টিক (উত্তর নিরক্ষীয়, উপসাগরীয়, উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ ও ক্যানারি স্রোত) এবং দক্ষিণে দক্ষিণ আটলান্টিক স্রোতচক্র (কুমেরু, বেঙ্গুয়েলা, দক্ষিণ নিরক্ষীয় ও ব্রাজিল স্রোত)। এই দুটি স্রোতচক্রের বাইরেও কিছু উষ্ণ ও শীতল স্রোত আছে। নিচে সারণিতে তা দেখানো হলো-

সারণি-৮.১: আটলান্টিক মহাসাগরীয় উষ্ণ ও শীতল স্রোত

প্রধান স্রোতউষ্ণ স্রোতশীতল স্রোত
উত্তর আটলান্টিক

১. উত্তর নিরক্ষীয়

২. নিরক্ষীয় প্রতিস্রোত

৩. বাহামা

৪. উপসাগরীয়

৫. উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ

৬. গিনি

১. পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড

২. সুমেরু

৩. ল্যাব্রাডর

৪. ইরমিনজার

৫. ক্যানারি

দক্ষিণ আটলান্টিক১. দক্ষিণ নিরক্ষীয়
২. ব্রাজিল
১. কুমেরু
২. ফকল্যান্ড
৩. বেঙ্গুয়েলা

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Current of the South Atlantic Ocean)

১. কুমেরু স্রোত (Antarctic current): প্রত্যয়ন বায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে শীতল কুমেরু স্রোত সৃষ্টি হয়ে উত্তর-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্রোতটির একটি শাখা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে ও অপরটি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল দিয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়।

২. বেঙ্গুয়ালো স্রোত (Benguela current): কুমেরু স্রোতের যে শাখা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে বেঙ্গুয়ালার
নিকট দিয়ে উত্তরে অগ্রসর হয় তা বেঙ্গুয়েলা স্রোত নামে পরিচিত। এই শীতল স্রোত ক্রমে উষ্ণ হয়ে পৃথিবীর আবর্তন ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর প্রভাবে পশ্চিমে বেঁকে যায়।

৩. দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত (South Equatorial current): বেঙ্গুয়েলা স্রোত যখন নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিয়ে সোজা পশ্চিমে অগ্রসর হয় তখন তা দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত নামে অভিহিত হয়। এই স্রোত দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ব্রাজিলের সেন্টরক অন্তরীপে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। একটি ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রবেশ করে এবং অপরটি দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয়।

৪. ব্রাজিল স্রোত (Brazil current): দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখা দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা উপকূল দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় তা ব্রাজিল স্রোত নামে পরিচিত। এই স্রোত দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পৃথিবীর আবর্তনগতি ও পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে আবার শীতল কুমেরু স্রোতের সাথে মিলিত হয়।

৫. ফকল্যান্ড স্রোত (Falkland current): দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে প্রধান স্রোতচক্রের চারটি স্রোত ছাড়াও কুমেরু স্রোতের একটি ক্ষুদ্র শাখা ফকল্যান্ড দ্বীপের নিকট দিয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ব্রাজিল স্রোতের সাথে মিলিত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এটি ফকল্যান্ড স্রোত নামে পরিচিত।

উপরের আলোচনায় দেখা যায়, নিম্ন অক্ষাংশে শীতল পরিবেশে সৃষ্ট কুমেরু স্রোত চক্রাকারে ঘুরে পূর্বের স্থানে আসছে এবং এর নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে পশ্চিমা বায়ু, স্থলভাগের বাধা, পৃথিবীর আবর্তন ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু। তবে নিরক্ষীয় অঞ্চলে উষ্ণতাজনিত পানিস্বল্পতা (ঘনত্বে ও পরিমাণে) মেরু অঞ্চলের উদ্বৃত্ত পানিকে আকৃষ্ট করছে। শীতল কুমেরু স্রোতটি মূলত এন্টার্কটিক অঞ্চল থেকে প্রশান্ত, আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর এই তিন মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং প্রত্যেক মহাসাগরেই একটি করে উত্তরমুখী শাখা সৃষ্টি করে স্রোতচক্র সৃষ্টির কারণ হিসেবে কাজ করে। তাই শুধু নিরক্ষরেখার দক্ষিণ নয়, উত্তরাংশের স্রোতচক্র সৃষ্টিতেও এর অবদান অনস্বীকার্য।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Current of the North Atlantic Ocean)

উত্তর আটলান্টিকেও দক্ষিণের মতো একটি প্রধান স্রোতচক্র রয়েছে এবং এর মধ্যস্থলে লক্ষ লক্ষ বর্গমাইল এলাকাব্যাপী বিশাল শৈবাল সাগরে স্রোতের প্রবাহ না থাকায় শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদের সঞ্চয়ন ঘটেছে। তবে উত্তর আটলান্টিকে দক্ষিণের তুলনায় স্রোতের সংখ্যা বেশি। এখানে প্রধান স্রোতচক্রের বাইরে অনেকগুলো ক্ষুদ্র স্রোত সৃষ্টি হয়েছে।

১. উপসাগরীয় স্রোত (Gulf Current): দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের একটি শাখা নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ
আমেরিকার উত্তর উপকূল দিয়ে ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রবেশ করে। সেখানে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের একটি শাখা এসে মিলিত হয়। এই মিলিত স্রোত মেক্সিকো উপসাগরে প্রবেশ করে উপসাগরীয় স্রোত নাম ধারণ করে। ফ্লোরিডা প্রণালির মধ্য দিয়ে এই স্রোত প্রবলবেগে বের হয়ে আসলে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের আরেকটি শাখা এর সাথে মিলিত হয়। এই স্রোত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল দিয়ে অগ্রসর হয়ে সেন্ট হ্যাটেরাস অন্তরীপের নিকট দক্ষিণ-পশ্চিম প্রত্যয়ন বায়ুর প্রভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। এই বিখ্যাত সমুদ্রস্রোতের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪.৫০ মাইল এবং বিস্তার ৪০-৩০০ মাইল। উষ্ণতা স্থানভেদে °-°ফারেনহাইট।

২. উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ (North atlantic current): পশ্চিমা বায়ু দ্বারা তাড়িত হয়ে উপসাগরীয় স্রোতের যে
শাখা আটলান্টিকের উত্তর দিকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও নরওয়ের উপকূলের দিকে যায়, তা উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ নামে পরিচিত। এর প্রভাবে ব্রিটিশ ও নরওয়ের উপকূল বরফমুক্ত থাকে।
৩. ক্যানারি স্রোত (Canary current): উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের একটি শাখা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে পর্তুগালের
পশ্চিমে উপকূলের দিকে যায়। পরে ফেরেলের সূত্রানুসারে দক্ষিণে বেঁকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয়। উপসাগরীয় স্রোত উষ্ণ হলেও উত্তর মহাসাগরের দিক থেকে আগত সুমেরু স্রোতের একটি শাখা অন্তঃস্রোতরূপে এর সাথে মিলিত হয়ে স্রোতটিকে শীতল স্রোতে পরিণত করে।
৪. উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত (North equatorial current): ক্যানারি স্রোত উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বেঁকে নিরক্ষরেখার উত্তর দিয়ে সোজা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এই উষ্ণ স্রোতটি উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত নামে পরিচিত। এটি পশ্চিমে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের নিকট দু'ভাগে বিভক্ত হয়। পরবর্তীতে দুটি শাখাই উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের সাথে মিলিত হয়।

৫. বাহামা স্রোত (Bahama current): উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখাটি বাহামা দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে উপসাগরীয় স্রোতের সাথে মিলিত হয় তা বাহামা স্রোত নামে পরিচিত।
৬. গিনি স্রোত (Guinea current): নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে এসে ক্যানারি স্রোতের একটি শাখার সাথে মিলিত হয়ে গিনি উপসাগরে প্রবেশ করে। গিনি স্রোত নাম নিয়ে তা নিরক্ষরেখা ও গিনি উপসাগর অতিক্রম করে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল দিয়ে বেঙ্গুয়ালা স্রোতের পূর্বপার্শ্বে বিলীন হয়ে যায়।
উপসাগরীয় স্রোত, উত্তর আটলান্টিক প্রবাহ, ক্যানারি ও উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত মিলেই উত্তর আটলান্টিকের স্রোতচক্র এবং এর মধ্যস্থলে শৈবাল সাগর সৃষ্টি হয়েছে।
৭. পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত (East-west greenland current): গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে সুমেরু স্রোতের দুটি শাখা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এরা যথাক্রমে পূর্ব গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত হিসাবে পরিচিত।
৮. ল্যাব্রাডর স্রোত (Labrador current): পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড স্রোত কানাডার ল্যাব্রাডর উপদ্বীপের নিকট মিলিত হয়ে ল্যাব্রাডর স্রোত নামে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট দু'ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি শাখা উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে এবং অপর শাখা উপসাগরীয় স্রোতের নিচ দিয়ে প্রবাহিত।
নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের নীল ও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সবুজ পানির সীমারেখাকে হিমপ্রাচীর বলে। দুই স্রোতের মিলনস্থলে প্রায়ই ঝড়-ঝঞ্ঝা ও ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হয়। নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের অদূরে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের আনীত হিমশৈল উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের সংস্পর্শে গলে গিয়ে অগভীর মহীসোপানে গ্রান্ড ব্যাংকস নামে মগ্নচড়া সৃষ্টি করেছে। প্রচুর প্লাঙ্কটন থাকায় এই গ্রান্ড ব্যাংকস বিশ্বের অন্যতম সেরা মৎস্যচারণক্ষেত্র।

৯. সুমেরু স্রোত (Arctic current): সুমেরু মহাসাগর হতে আগত স্রোত গ্রিনল্যান্ডের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত
হওয়া ছাড়াও অন্তঃস্রোতরূপে উত্তর আটলান্টিকের নিচ দিয়ে, ক্যানারি স্রোতের সাথে মিলিত হয়ে সেটাকে শীতল স্রোতে পরিণত করে। মেরুদেশীয় বায়ুর প্রভাব এবং সুমেরু ও আটলান্টিক মহাসাগরের লবণাক্ততার পার্থক্যের দরুন এই স্রোতের উদ্ভব হয়
১০. ইরমিনজার স্রোত (Irminger current): সুমেরু সাগর থেকে আইসল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূল দিয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে উত্তর আটলান্টিক স্রোতের ঘূর্ণাবর্তে এটি শেষ হয়ে যায়।
১১. নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত (Equatorial counter current): উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের মধ্যবর্তী স্থানে নিরক্ষরেখার ঈষৎ উত্তরে সোজা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে যে স্রোত প্রবাহিত হয় তাকে নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত বলে।

স্রোতের নামকোন স্রোত থেকে বের হয়েছেকোন স্রোতের সাথে মিলিত হয়েছে
উপসাগরীয়নিরক্ষীয়উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের শাখা
ক্যানারিউপসাগরীয়
বাহামা
গিনি
ল্যাব্রাডর
সুমেরু
ইরমিনজার

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Influences of Oceanic Current ofAtlantic)

আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ ও শীতল স্রোতগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আটলান্টিকের পশ্চিম তীরে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব তীরে ইউরোপ ও আফ্রিকার অবস্থান। এসব অঞ্চলের জলবায়ু, কৃষি ছাড়াও সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য, আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূলীয় স্রোত দ্বারা প্রভাবিত হয়।

উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে যথেষ্ট বৃষ্টিপাত ঘটায়। তাছাড়া এই স্রোতপথে অতি সহজে উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানো যায়। বিশ্বের সমুদ্রপথের সর্বাধিক যাত্রী ও পণ্য এই পথে পরিবাহিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইংল্যান্ড ও নরওয়ে উপকূল এই স্রোতের প্রভাবে বরফমুক্ত থাকে এবং উপকূলে বৃষ্টিপাত ঘটে। ফলে কৃষিকার্যে সহায়ক পরিবেশ ছাড়াও শৈত্যের প্রভাব কমে যাওয়ায় বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

উত্তর আটলান্টিকের সুমেরু ও ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে কানাডার উপকূলে বরফ জমে থাকা ছাড়াও এসব স্রোতপথে হিমশৈল থাকায় জাহাজ চলাচলে সমস্যা হয়। ল্যাব্রাডার ও উপসাগরীয় স্রোতের মিলনস্থলে ব্যাপক কুয়াশা ও তুষার ঝড়ে জাহাজ চলাচল ছাড়াও স্বাভাবিক কাজকর্ম ও জীবনধারণে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তবে হিমশৈল উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে গলে গিয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডে মগ্নচড়া সৃষ্টি করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৎস্যচারণক্ষেত্র 'গ্রান্ড ব্যাংকস' সৃষ্টি করেছে। এছাড়া নরওয়ের নিকট ডগার ব্যাংকস মৎস্যচারণক্ষেত্রও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের শাখা উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে সুমেরু থেকে ভেসে আসা হিমশৈল গলনের ফল।

উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের অনুকূলে জাহাজ চালনা করে ইউরোপ থেকে নিরাপদে ও অল্প সময়ে উত্তর আমেরিকায় পৌছানো যায়। পূর্বে পালতোলা জাহাজসমূহ এই পথেই চলাচল করতো। এই পথেই কলম্বাস ও আমেরিগো ভেসপুচি ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও আমেরিকা পৌঁছান। তাছাড়া এই উষ্ণ স্রোত ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে যথেষ্ট বৃষ্টিপাত ঘটায়।
দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল ও মেক্সিকোতে সারা বছর বৃষ্টিপাত ঘটে। ফলে এ অঞ্চলে কৃষিকাজ যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছে।

সবদিক বিবেচনায় আটলান্টিকের উষ্ণ স্রোতসমূহ জলবায়ু, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে তবে শীতল স্রোতের প্রভাব বেশ নেতিবাচক।

[সমুদ্রস্রোত জলবায়ুর উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
যেসব দেশের নিকট দিয়ে উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হয় সেসব দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং শীতল সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হলে জলবায়ু অপেক্ষাকৃত শীতল হয়। শীতল ল্যাব্রাডার স্রোতের প্রভাবে উত্তর আমেরিকার সেন্ট লরেন্স নদী ও তার মোহনা বছরের প্রায় নয় মাসই বরফাকৃত থাকে। উষ্ণ স্রোতের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুতে অধিক জলীয়বাষ্প থাকে বলে তা স্থলভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বৃষ্টিপাত ঘটায়।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Current of the Indian Ocean)

প্রশান্ত ও আটলান্টিকের স্রোতচক্রের (cycle of currents) সাথে ভারত মহাসাগরের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছ। নিরক্ষরেখার দক্ষিণে ভারত মহাসাগরীয় স্রোতের সাথে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতচক্রের যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকলেও উত্তর ভারত মহাসাগরের স্রোত পদ্ধতি ভিন্ন। এখানে কোনো স্রোতচক্র সৃষ্টি হয়নি। এ মহাসাগরে পার্শ্ববর্তী স্থলভাগের (এশিয়া মহাদেশ) প্রাধান্য বেশি এবং স্রোত মৌসুমি বায়ুগুলো দ্বারা প্রভাবিত।

সারণি-৮.২: ভারত মহাসাগরের উষ্ণ ও শীতল স্রোত

অবস্থানউষ্ণ স্রোতশীতল স্রোত
দক্ষিণ ভারত মহাসাগর

১. দক্ষিণ নিরক্ষীয়

২. মোজাম্বিক

৩. মাদাগাস্কার

৪. আগুলহাস

১. কুমেরু

২. পশ্চিম অস্ট্রেলিয়

উত্তর ভারত মহাসাগর

১. সোমালি

২. শীতকালীন মৌসুমি

৩. গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি

৪. নিরক্ষীয় বিপরীত

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Currents of the South Indian Ocean)

১. কুমেরু স্রোত (Antarctic current): পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এন্টার্কটিকায় একটি স্রোত সৃষ্টি হয়ে সমগ্র
অঞ্চলে চক্রাকারে প্রবাহিত হয়। এই স্রোত প্রশান্ত ও আটলান্টিক অতিক্রম করে আফ্রিকার দক্ষিণ দিয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে এবং সোজা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে উপনীত হয়। সেখানে একটি শাখা অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূল দিয়ে পুনরায় প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করে কুমেরু স্রোতচক্র তৈরি করেছে। অপর শাখা অস্ট্রেলিয়ার লিউইন অন্তরীপে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উত্তরে অগ্রসর হয়। এই স্রোতকে পশ্চিমা স্রোতও বলা হয়ে থাকে।

২. পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোত (West australian current): কুমেরু স্রোতের যে শাখা অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে
বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দেশটির পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে উত্তরে অগ্রসর হয় তা পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোত হিসাবে পরিচিত। এটি আটলান্টিকের বেঙ্গুয়েলা ও প্রশান্ত মহাসাগরের পেরু বা হামবোল্ড স্রোতের সাথে তুলনীয়। এই শীতল স্রোতটি ক্রমান্বয়ে উত্তরগামী হয়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে ক্রমে উষ্ণস্রোতে পরিণত হয় এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের একটি শাখার সাথে মিলিত হয়।

৩. দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত (South equatorial current): পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া স্রোত দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর প্রভাব ও পৃথিবীর আবর্তনে পশ্চিমে বেঁকে নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিক দিয়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছে। এই স্রোতটি দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত হিসাবে পরিচিত। মাদাগাস্কার দ্বীপের নিকট স্রোতটি দু'ভাগে বিভক্ত হয়। একটি দ্বীপের উভয় দিক দিয়ে দক্ষিণমুখী এবং অপরটি উত্তরমুখী হয়।

৪. মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিক স্রোত (Madagascar and Muzambique current): দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখা মাদাগাস্কার দ্বীপের পূর্ব দিয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হয় তা মাদাগাস্কার স্রোত এবং যে শাখাটি দ্বীপের পশ্চিম পার্শ্বে মোজাম্বিক প্রণালির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় তা মোজাম্বিক স্রোত নামে পরিচিত।

৫. আগুলহাস স্রোত (Agulhus current): মাদাগাস্কার দ্বীপের দক্ষিণে মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিক স্রোত একত্রে মিলিত হয়ে আগুলহাস স্রোত নামে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপের (দক্ষিণ-পশ্চিমগামী) নিকট পৌছে। যেখানে পশ্চিমা বায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে পুনরায় শীতল কুমেরু স্রোতের সাথে মিলিত হয়

দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে কুমেরু, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়, দক্ষিণ নিরক্ষীয়, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার ও আগুলহাস স্রোত চক্রাকারে প্রবাহিত হচ্ছে। এটি অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও মূলত একই স্রোত এবং দক্ষিণ আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের স্রোতচক্রের মতো একই নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Currents of the North Indian Ocean)

১. সোমালি স্রোত (Somali current): দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখা সোমালিয়ার উপকূল দিয়ে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয় তা সোমালি স্রোত নামে পরিচিত।

২. গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোত (Summer monsoon current): সোমালি স্রোতের একটি বর্ধিত অংশ গ্রীষ্মকালে
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তর পূর্বাভিমুখী হয়ে প্রথমে আরব সাগর ও পরবর্তীতে ভারতের পশ্চিম উপকূল ও শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ পার্শ্ব দিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তরদিকে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশের উপকূলের নিকট স্থলভাগের বাধার কারণে দক্ষিণে আন্দামানের দিকে ধাবিত হয়ে স্রোতটি এক পর্যায়ে ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রার পশ্চিম পার্শ্বে নিরক্ষীয় স্রোতের সাথে মিলিত হয়।

৩. শীতকালীন মৌসুমি স্রোত (Winter monsoon current): প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের একটি
শাখা মালয় উপদ্বীপ (মালয়েশিয়া) ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশ দিয়ে আন্দামান সাগরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে স্রোতটি বঙ্গোপসাগরে আসলে উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু (ঐ এলাকায় যা শীতকালীন মৌসুমি বায়ু হিসাবে পরিচিত) দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোতের বিপরীত পথ বরাবর আরব সাগর ঘুরে সোমালিয়ার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হয়। স্রোতটি শীতকালীন মৌসুমি স্রোত অথবা ভারত মহাসাগরীয় উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত হিসাবে পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতই গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রত্যয়ন বায়ুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিপরীতমুখী গতিপ্রাপ্ত হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষাকালের সূচনা করে।

৪. ভারত মহাসাগরীয় নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত (Equatorial counter currents of indian ocean): শীতকালীন মৌসুমি স্রোত সোমালিয়ার দক্ষিণ উপকূল দিয়ে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে নিরক্ষরেখা বরাবর সোজা পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। সুমাত্রা দ্বীপের নিকট এটি বেঁকে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের সাথে মিলিত হয়। স্রোতটি ভারত মহাসাগরীয় নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত হিসাবে পরিচিত।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Influences of India Oceanic Currents)

ভারত মহাসাগরের স্রোতগুলোর বৈশিষ্ট্য কিছুটা হলেও অন্যান্য মহাসাগর থেকে পৃথক। বিশেষত উত্তর ভারত মহাসাগরের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোত সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এই স্রোতের প্রভাবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় এবং বর্ষাকাল হিসাবে একটি ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি আবির্ভাবের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিকাজ এই মৌসুমি স্রোতপ্রবাহ ও তজ্জনিত বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের কৃষির একটা বড় অংশ এবং মৎস্য প্রজনন বর্ষার ওপর নির্ভরশীল।

গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমি স্রোত সামুদ্রিক পরিবহনের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। গ্রীষ্মের শুরুতে বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিতে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোতের গতিপথে অল্প সময়ে জাহাজ উপকূলে পৌছাতে পারে। আবার শীতকালীন মৌসুমি স্রোত প্রবাহিত হয় পূর্ণ উৎপাদন মৌসুমের পর। উক্ত স্রোত পথে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ বা আমেরিকাতে কম সময়ে জাহাজে পণ্য পরিবাহিত হয়।
আফ্রিকার উপকূলে উষ্ণ সোমালি, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার ও আগুলহাস স্রোত প্রবাহিত থাকার কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং এ এলাকাগুলো কৃষিকার্যে যথেষ্ট উন্নত। বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের কারণে উক্ত এলাকাগুলোতে যথেষ্ট বর্ষজীবী উদ্ভিজ্জ জন্মাতে দেখা যায়। উষ্ণ স্রোতের গতিপথে সামুদ্রিক জাহাজগুলোও দ্রুত যাতায়াত করতে পারে।

সমুদ্রস্রোত সামুদ্রিক জীবকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
প্রবালকীট ছোট সামুদ্রিক জীব। ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ পানিতে প্রবালটি ব্যাপকভাবে বাস করে। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পানির উষ্ণতা কম বলে সেখানে প্রবালকীট থাকে না। এরা মাছের মতো চলাফেরা করে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না। পানির মৃদু স্রোত এদের জন্য খাদ্য বহন করে আনে। আবার সমুদ্রস্রোত বেশি হলে এরা নষ্ট হয়ে যায়। স্রোতের ফলে এরা একস্থান হতে অন্য স্থানে বাহিত হতে পারে। এই প্রবালকীট বংশানুক্রমে একই স্থানে বাস করে এবং বহুদূরব্যাপী এদের মৃতদেহ ধীরে ধীরে সঞ্চিত ও বিস্তৃত হয়ে দ্বীপের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন এরূপ একটি প্রবালদ্বীপ ।

উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত থাকার কারণে মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও সুমাত্রা উপকূলের জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং উপকূলীয় এলাকার বৃষ্টিপাতে স্রোতগুলো প্রভাব বিস্তার করে। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে প্রবাহিত স্রোতটি পর্যায়ক্রমে উষ্ণতাপ্রাপ্ত হয় বিধায় ঐ উপকূলে বৃষ্টিপাত কম হয়। ফলে উপকূলীয় এলাকায় জলাভূমি (দক্ষিণ পার্শ্বে) সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্রোতের উত্তরাংশে উপকূল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি বলে (উষ্ণতা বাড়ার কারণে) ঘন বনাঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে।
উষ্ণ দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতপথে অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে জাহাজ আফ্রিকার পথে এবং আফ্রিকা থেকে নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত কিংবা গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি স্রোত পথে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল করে।
সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, ভারত মহাসাগরীয় স্রোতগুলো উপকূলীয় এলাকার জলবায়ু, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Definition of Ebb-Tide)

সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি সবসময় একই সমতলে থাকে না; দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক স্থানে ফুলে ওঠে এবং অন্য স্থানে নেমে যায়। পানির এ ফুলে উঠাকে জোয়ার (flow or high tide) এবং নেমে যাওয়াকে ভাটা (ebb or low tide) বলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি কোনো স্থানে একবার ফুলে ওঠার ৬ ঘণ্টা ১৩ মি. পরে নেমে যায় অর্থাৎ ভাটা হয়। আবার ঐ স্থানে ভাটা হওয়ার ৬ ঘণ্টা ১৩ মি. পরে পুনরায় সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে অর্থাৎ জোয়ার হয়। সুতরাং আমরা বলতে পারি, সমুদ্রে একবার জোয়ার হওয়ায় ১২ ঘণ্টা ২৬ মি. পর পুনরায় জোয়ার হয়। পৃথিবীর উপর চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণ, কেন্দ্রাতিগ বল ও মহাকর্ষ শক্তির আকর্ষণে মূলত জোয়ার-ভাটা হয়ে থাকে।

Trujillo (১৯৯৯)-এর মতে, 'জোয়ার-ভাটা হলো সমুদ্রের পানির নির্দিষ্ট অবস্থান বা সমুদ্র সমতল থেকে পানির নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী ওঠানামা।' সমুদ্রের পানির এই ওঠানামা মূলত চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণেই হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোর আকর্ষণও কিছুটা কাজ করে। P.R. Pinet (2000)-এর মতে, 'জোয়ার-ভাটা হলো সাধারণ বায়ুতাড়িত সমুদ্রতরঙ্গের চেয়ে অনেক দীর্ঘ তরঙ্গ, যা অসাধারণ নিয়মতান্ত্রিকতায় নিয়মিতভাবে সমুদ্র সমতল ওঠানামার দ্বারা আবির্ভূত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার-ভাটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলেও মাঝসমুদ্রে এর প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হয় না।

জোয়ার-ভাটার কারণ (Causes of Ebb-Tide)

সমুদ্র এবং উপকূলবর্তী নদীর জলরাশি প্রতিদিনই কোনো একটি সময়ে ধীরে ধীরে ফুলে উঠছে এবং কিছুক্ষণ পরে আবার তা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। জলরাশির এ রকম নিয়মিত স্ফীতি বা ফুলে উঠাকে জোয়ার ও নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।
প্রাচীনকালে ধারণা ছিল পৃথিবীর শ্বাস গ্রহণের সময় পানি ফুলে জোয়ার এবং শ্বাস ত্যাগ করার সময় পানি নেমে গিয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ মনে করেন, পৃথিবীর ওপর চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের দরুন সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ শক্তিই জোয়ার-ভাটার জন্য দায়ী।

ক. মহাকর্ষের প্রভাব: মহাশূন্যে প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহই পরস্পরকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে। এ আকর্ষণের নাম
মহাকর্ষ। এ আকর্ষণের ফলে পৃথিবীসহ সকল গ্রহ সূর্যের চারদিকে এবং সকল উপগ্রহ গ্রহগুলোর চারদিকে ঘুরছে। এ আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পৃথিবীর উপরিভাগের তরল পানিরাশি, পৃথিবী হতে চ্যুত হতে পারে না কিন্তু স্ফীত হয়। এ মহাকর্ষশক্তির প্রভাব আবার সর্বত্র সমান নয়। যে গ্রহ বা উপগ্রহ যত বড় তার আকর্ষণ ক্ষমতা তত বেশি। আবার দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে এ আকর্ষণ ক্ষমতা কমে যায়। অতএব, মহাকর্ষশক্তি দুইটি নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে। যথা:

১. সরাসরি জ্যোতিষ্কের আয়তনের (ভর) ওপর এবং
২. জ্যোতিষ্কের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতের ওপর। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সূত্রটি,

F=Gm1m2d2

এখানে,

F = আকর্ষণ বল .

G = মহাকর্ষীয় ধ্রুবক

d = দূরত্ব

m1= পৃথিবীর ভর/আয়তন

m2 = চন্দ্রের ভর/আয়তন

সূর্য, চাঁদ অপেক্ষা দুই কোটি ষাট লক্ষ গুণ বড়। কিন্তু সূর্য, চাঁদ অপেক্ষা পৃথিবী হতে ৩৮০ গুণ দূরে অবস্থিত। এ জন্য পৃথিবীর ওপর সূর্য থেকে চাঁদের আকর্ষণ অনেক বেশি এবং অধিক কার্যকর। এ আকর্ষণশক্তি সূর্য থেকে ২.৫ গুণ বেশি। এ জন্যই চাঁদের আকর্ষণে পানিরাশি অধিক ফুলে ওঠে এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এ আকর্ষণশক্তি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে কাজ করে, কিন্তু পানি তরল বলে এর উপরিভাগে আকর্ষণ শক্তি অধিক কার্যকরী হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর কেন্দ্র ও পানির উপরিভাগের ওপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণশক্তির তারতম্যই জোয়ার-ভাটার কারণ।

খ. কেন্দ্রাভিমুখী প্রভাব কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবেও জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হতে পারে। পৃথিবী তার অক্ষ বা মেরুদন্ডের ওপর চারদিকে দ্রুত বেগে ঘুরে। এ ঘূর্ণন গতির ফলে ভূপৃষ্ঠ হতে তরল পানিরাশি চতুর্দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবণতা লাভ করে। একেই কেন্দ্রাভিমুখী বা বিকর্ষণশক্তি বলে। পৃথিবী নিজ কক্ষপথে ১,৬১০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে। পৃথিবী ও চাঁদের আবর্তনের জন্য ভূপৃষ্ঠের তরল ও হালকা পানিরাশির ওপর কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাব অধিক হয়। এর ফলে পানিরাশি ভূভাগ হতে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। এভাবে কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি জোয়ার সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সূত্রটি হচ্ছে-

C=mv2r

এখানে, C = কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি

m = পৃথিবীর ভর

v = পৃথিবীর গতিবেগ

r = ব্যাসার্ধ

ভাটার কারণ: পৃথিবীর মোট পানিরাশির পরিমাণ সব জায়গায় (উপরিতল) সমান। পৃথিবীর এক অংশে যখন মুখ্য জোয়ার ও তার বিপরীত অংশে গৌণ জোয়ার হয়; তখন ঐ স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী সমকোণে অবস্থিত অংশদ্বয় থেকে পানিরাশি আগের স্থানদ্বয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে পানিরাশি কমে যায়। ফলে ঐ স্থানদ্বয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়। এক স্থানে প্রতিদিন দুইবার ভাটা হয়। জোয়ার ও ভাটা প্রত্যেকটির স্থিতিকাল প্রায় ৬ ঘণ্টা।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Classification of Ebb-Tide)

মহাকর্ষ ও কেন্দ্রাতিগ (granitational and centrifugul) শক্তির তারতম্যের কারণে জোয়ারের ধরনের পরিবর্তন হয়। পৃথিবীর সাথে চন্দ্র ও সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থানের পরিবর্তনও জোয়ারের ধরনে প্রভাব বিস্তার করে। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা
প্রধানত: নিম্নোক্ত জোয়ারসমূহ সনাক্ত করেছেন। যথা-

১. মুখ্য জোয়ার (Primary tide);
২. গৌণ জোয়ার (Secondary tide);
৩. ভরা কটাল ও (Spring tide); এবং
৪. মরা কটাল। (Neap tide)

এছাড়া ভূপৃষ্ঠে সময় ও স্থানভেদে কিছু বিশেষ
জোয়ার পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

১. দৈনিক, অধদৈনিক ও মিশ্র জোয়ার (Diurnal, semi diurnal and mixed tides); এবং
২. ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় জোয়ার (Tropical and equitorial tides) ।

১. মুখ্য জোয়ার (Primary tide); চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। আবর্তনকালে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের কাছে অর্থাৎ ঠিক সামনে উপস্থিত হয় সেখানে চাঁদের আকর্ষণ বেশি হয়। স্থল অপেক্ষা পানিরাশির ওপর এ আকর্ষণশক্তির কার্যকারিতা অনেক বেশি বলে চারদিক থেকে পানি ঐ আকর্ষণস্থলের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে চাঁদের নিকটবর্তী অংশের পানিরাশি ফুলে উঠে। এ জোয়ারকে মুখ্য বা প্রত্যক্ষ জোয়ার বলে।

২. গৌণ জোয়ার (Secondary tide): চাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার
বিপরীত দিকে পানির নিচে যে কঠিন স্থলভাগ আছে তা পৃথিবীর কেন্দ্রের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। ফলে সেখানকার পানিরাশি অপেক্ষা স্থলভাগ চাঁদের দিকে অধিকতর আকর্ষিত হয়। এ সময় সেখানে পানিরাশির ওপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণশক্তির প্রভাব কমে যায় এবং কেন্দ্রাতিগ (centrifugul) শক্তির প্রভাবে চার পাশের পানিরাশি সেই স্থানে প্রবাহিত হয়ে জোয়ারের সৃষ্টি করে। এ জোয়ারকে দূরবর্তী (far), গৌণ (secondary) বা পরোক্ষ (indirect) জোয়ার বলে।

৩.
ভরা কটাল (Spring tide): চাঁদ ও সূর্যের জোয়ার উৎপন্ন করার ক্ষমতার অনুপাত ১১:৫। অমাবস্যায় চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর একই দিকে এক সঙ্গে সমসূত্রে (same line) অবস্থান করে। আবার পূর্ণিমার সময় পৃথিবীর এক দিকে সূর্য ও অপরদিকে চাঁদ থাকে এবং সমসূত্রে (same line) অবস্থান করে। এর ফলে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণশক্তি একই সঙ্গে কার্যকরী হয়। সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের তুলনায় কম হলেও উভয়ের মিলিত আকর্ষণ প্রবল।

পূর্ণিমা তিথিতে ভূপৃষ্ঠের যে স্থানে চাঁদের প্রভাবে মুখ্য জোয়ার হয়, সেই স্থানে সূর্যের প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়। আবার অমাবস্যায় চাঁদ ও সূর্য উভয়ের মিলিত আকর্ষণে শক্তিশালী মুখ্য জোয়ার হয়। এগুলো ভরা কটাল।

৪. মরা কটাল (Neap tide): অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য সমসূত্রে না থেকে উভয়ে পৃথিবীর সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। সুতরাং, সেই দিন জ্যোতিষ্কদ্বয়ের আকর্ষণ আড়াআড়িভাবে (সমকোণে) কার্যকরী হয়। এই সময় চাঁদের আকর্ষণে চাঁদ ও এর বিপরীত দিকে জোয়ার হয়। সূর্যের আকর্ষণেও সূর্য এবং এর বিপরীত দিকে জোয়ার হওয়ার কথা। কিন্তু সূর্য অপেক্ষা চাঁদের আকর্ষণশক্তি বেশি বলে চাঁদ ও এর বিপরীত দিকে জোয়ার কার্যকর হয়।

একই সঙ্গে সূর্য এবং এর বিপরীত দিকে ভাটা হয়। এর ফলে চন্দ্রের আকর্ষণের দিকে এবং এর বিপরীতে জোয়ারের পানি বেশি ফুলে উঠতে পারে না। ফলে জোয়ারের তীব্রতা কম হয়। এ কারণে এ জোয়ারকে মরা কটাল বলে।

এছাড়া সময় ও স্থানভেদে কতিপয় বিশেষ জোয়ার উল্লেখ করা যায়। যেমন-

১. দৈনিক, অর্থদৈনিক ও মিশ্র জোয়ার (Diurnal, semi diurnal and mixed tides): কোনো কোনো অঞ্চলে
২৪ ঘণ্টায় মাত্র একবার জোয়ার ও একবার ভাটা হয়। মেক্সিকো উপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের জোয়ার হয়ে থাকে। এটা দৈনিক জোয়ার নামে অভিহিত। অর্ধদৈনিক জোয়ার বলতে বুঝায় দৈনিক দু'বার জোয়ার ও দু'বার ভাটা। বঙ্গোপসাগর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আটলান্টিক উপকূলে এ ধরনের জোয়ার দেখা যায়। এছাড়া কোনো কোনো স্থানে দৈনিক ও অর্ধ-দৈনিকের মত পানি উঠানামা করে কিন্তু প্রতিবার পানির উচ্চতার পার্থক্য থাকে। এটা মিশ্র জোয়ার নামে অভিহিত। ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে এ ধরনের জোয়ার দেখা যায়।

২. ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় জোয়ার (Tropical and Equitorial tides): প্রতিমাসে দু'বার চন্দ্রের উত্তরায়ন ও
দক্ষিণায়নের ফলে কর্কটীয় ও মকরীয় অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ জোয়ার হয় যা ক্রান্তীয় জোয়ার নামে অভিহিত। নিরক্ষীয় এলাকায় চন্দ্র লম্বভাবে আকর্ষণ করায় সেখানে জোয়ারের উচ্চতায় তেমন পার্থক্য হয় না। এটা নিরক্ষীয় জোয়ার নামে অভিহিত।
সমুদ্রের মধ্যভাগে পানি সাধারণত ১- ৩ মাত্রায় উঁচুনিচু হয়। কিন্তু উপকূলের নিকট সাগর, উপসাগরের গভীরতা কম বলে পানিরাশি সেখানে অনেক বেশি উঁচু-নিচু হয়। এ জন্য সমুদ্রের মোহনা হতে নদীসমূহের গতিপথে কয়েক মাইলব্যাপী জোয়ার-ভাটা অনুভূত হয়। উল্লেখ, ভূপৃষ্ঠের যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয় তার প্রতিপাদ স্থানে গৌণ জোয়ার হয়।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Results of Ebb-Tide)

আমরা জানি, জোয়ার-ভাটা বিপুল শক্তির উৎস এবং তা মানুষের জন্য যথেষ্ট কল্যাণ বয়ে আনে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও জোয়ার-ভাটার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ক. কল্যাণকর প্রভাব:

১. নদীবন্দর বরফমুক্ত থাকা: জোয়ার-ভাটার ফলে নদীর পানি স্বল্প পরিমাণে লবণাক্ত হওয়ায় শীতে সহজে জমে যায় না। ফলে নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলেও শীতে নদীর পানি জমে না এবং নৌচলাচলের যোগ্য থাকে। এ কারণেই ইংল্যান্ডের অনেক নদীবন্দর বারো মাস বরফমুক্ত থাকে।

২. বন্দরের সুবিধা: জোয়ারের সময় পানি বৃদ্ধি পায় বলে সমুদ্রগামী জাহাজের পক্ষে নদীবন্দরে প্রবেশে সুবিধা হয়। আবার ভাটার স্রোতের সাথে ঐ জাহাজ অনায়াসে সমুদ্রে এসে পড়ে। চট্টগ্রাম, মংলা, কলকাতা, লন্ডন প্রভৃতি বন্দরে জোয়ারের সময় জাহাজ প্রবেশ করে এবং ভাটার সময় সমুদ্রে বের হয়ে আসে।

৩. নদীর পানি নির্মল থাকা: দৈনিক দুই বার করে জোয়ার-ভাটা হওয়ার ফলে নদীতে সঞ্চিত সব আবর্জনা ধুয়ে মুছে গভীর সমুদ্রে চলে যায়। এজন্য জোয়ার-ভাটার ফলে নদীর পানি নির্মল থাকে।

৪. নদীমুখের নাব্য রক্ষা জোয়ার-ভাটার জন্য পলিমাটি পড়ে নদীর মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। ফলে নৌচলাচলের যোগ্য থাকে।

৫. পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা পৃথিবীর অনেক অংশে বিরাট আকারের জলাধার নির্মাণ করে জোয়ারের সময় পানিতে ভর্তি করে রাখা হয়। ভাটার সময় ঐ পানি সরু পথে নিচে নির্গত করে টারবাইনের সাহায্যে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের লা-রান্স ফাঁড়িতে সর্বপ্রথম জোয়ার-ভাটার বৈদ্যুতিক শক্তি কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়, যার প্রাথমিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১০ হাজার কিলোওয়াট। বর্তমানে এখান থেকে বার্ষিক ৮০ লক্ষ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।

৬. মাছ পালন ও শিকার জোয়ার-ভাটা বণ্টন বা বিন্যাসের সহায়ক হওয়ায় জৈবিকভাবে প্লাঙ্কটন ও নোকটনগুলোর সমুদ্র উপকূলীয় পানিতে বণ্টন ও পুনঃবণ্টনে সুবিধা হয়, যা মাছ পালন ও শিকার (মৎস্য) শিল্পের সহায়ক। জোয়ারের সময় নদী পার্শ্ববর্তী নিচু এলাকাগুলোতে সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি ধরে রেখে চিংড়ি চাষ করা হয়। ফলে বহু দেশ (যেমন- বাংলাদেশ) চিংড়ি রপ্তানি করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নতি লাভ করে।

৭. লবণ উৎপাদন: জোয়ারের সময় সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি পার্শ্ববর্তী জমিতে ধরে রেখে সূর্য তাপে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি দূর করে বহু দেশ প্রাকৃতিকভাবে লবণ উৎপন্ন করে। এই লবণ রন্ধন কাজ ছাড়াও মাটির ক্ষারীয় প্রভাব দূরীকরণে ও পুকুরে মাছ চাষের কাজে ব্যবহৃত হয়।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, জোয়ার-ভাটা নদীর পানি নির্মল রাখতে, নদী খাতের গভীরতা বৃদ্ধি করতে, নদী ও নদীমুখ ভরাট হওয়া থেকে রক্ষা করতে, নদীর পানি শীতে জমে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে, প্লাঙ্কটন ও নোকটন বিন্যাস নিশ্চিত করতে, লবণ উৎপাদন করতে, চিংড়ি উৎপাদন নিশ্চিত করতে, নদী খাতগুলোকে উন্মুক্ত সাগরের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রক্ষা করতে এবং সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে সহায়তা করছে।

খ. ক্ষতিকর প্রভাব: জোয়ার-ভাটার অনুকূল দিক ছাড়াও জোয়ার-ভাটার কিছু ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। প্রবল জোয়ারের কারণে অনেক সময় নদী বা সমুদ্রের পানি পার্শ্ববর্তী শস্যক্ষেত্রে ঢুকে পড়ে। ফলে শস্যের ক্ষতিসাধন হয়।
আবার অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে জোয়ারের বান সৃষ্টি হলে নৌকা, লঞ্চ ডুবে যায় এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পানি প্রবেশ করে জানমালের ক্ষতি হয়।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By

(Ebb-Tide and Coastal Area of Bangladesh)

উপকূলবর্তী নদী বা খাঁড়িতে ঋতুভেদে নদীর পানির প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে জোয়ারের প্রভাবে বিরাট তারতম্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের উপকূলে জোয়ার-ভাটার পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য। জোয়ারের প্রভাব বাংলাদেশের উপকূলের খাঁড়ি থেকে বহুদূরে নদীর অভ্যন্তরে প্রায় গোয়ালন্দের নিকট পর্যন্ত পৌছে। শীত ঋতুতে নদীবাহিত পানির পরিমাণ গ্রীষ্ম ঋতুর তুলনায় অত্যন্ত কম। এজন্য শীত ঋতুতে জোয়ারের লবণাক্ত পানি নদীর অভ্যন্তরে বহুদূরে অগ্রসর হতে পারে। ফলে বহুদূর পর্যন্ত নদীর অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে মাঠের ফসল, গবাদি পশু ও শিল্পের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উপর জোয়ার-ভাটার যথেষ্ট প্রভাব আছে উপকূলবর্তী এলাকায় জোয়ার-ভাটার নিম্নের

প্রভাবসমূহ লক্ষ করা যায়:

১. জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে ভূখণ্ড থেকে আবর্জনাসমূহ নদীর মধ্য দিয়ে সমুদ্রে পতিত হয়।
২. নদীর মোহনা পরিষ্কার থাকে। দৈনিক দুবার জোয়ার-ভাটা হওয়ার ফলে ভাটার টানে নদীর মোহনায় পলি ও আবর্জনা জমতে পারে না।
৩. জোয়ার-ভাটার ফলে সৃষ্ট স্রোতের সাহায্যে নদীখাত গভীর হয়।
৪. নদীতে (কর্ণফুলি) ভাটার স্রোতের বিপরীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ (hydro-electricity) উৎপাদন করা হয়।
৫. জোয়ারের পানি নদীর মাধ্যমে সেচে সহায়তা করে এবং অনেক সময় খাল খনন করে জোয়ারের পানি আটকিয়ে সেচকার্যে ব্যবহার করা হয়।
৬. জোয়ার-ভাটার ফলে নৌযান চলাচলের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হয়। জোয়ারের সময় নদীর মোহনায় ও তার অভ্যন্তরে পানি অধিক হয় বলে বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজের পক্ষে নদীতে প্রবেশ করা সুবিধা হয়। আবার ভাটার টানে ঐ জাহাজ অনায়াসে সমুদ্রে নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা এবং অন্যান্য উপকূলবর্তী নদীবন্দর সচল রাখতে জোয়ার-ভাটার ভূমিকা রয়েছে।
৭. অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে জোয়ারের সময় বান ডাকার ফলে অনেক সময় নৌকা, লঞ্চ প্রভৃতি ডুবে যায়। এতে নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় জানমালের ক্ষতি হয়।

এ অধ্যায়ের প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ

সমুদ্রস্রোতসমুদ্রের উপরপৃষ্ঠে নিয়মিত প্রবহমান পানি রাশিকে সমুদ্রস্রোত বলে। পৃথিবীর আবর্তনজনিত কারণ, আবহাওয়া ও জলবায়ু, বাষ্পীভবন, সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন-তাপমাত্রার পার্থক্য, লবণাক্ততার তারতম্য, ঘনত্বের তারতম্য, ঋতুভিত্তিক তারতম্য, ইত্যাদি কারণে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি হয়।
মহাসাগরীয় স্রোতকুমেরু স্রোত, বেঙ্গুয়েলা স্রোত, উপসাগরীয় স্রোত, ক্যানারি স্রোত ইত্যাদি আটলান্টিক মহাসাগরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্রোত। পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোত, সোমালি স্রোত, মৌসুমি স্রোত, আপুলহাস স্রোত ইত্যাদি ভারত মহাসাগরীয় কয়েকটি স্রোত।
অন্তঃস্রোতআন্তঃস্রোত সমুদ্রপৃষ্ঠের বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত ও হালকা হয় এবং ঘনত্ব কমে যায়। অন্যদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। মেরু অঞ্চলের ভারি পানি অন্তঃস্রোত হিসেবে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে।
পৃষ্ঠস্রোতনিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত হয় এবং ঘনত্ব কমে যায়। অন্যদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে উত্তপ্ত পানি পৃষ্ঠস্রোত হিসেবে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে।
জোয়ার-ভাটাজোয়ার-ভাটা সমুদ্রের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। সাধারণত মহাকর্যের প্রভাব ও কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির কারণে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। জোয়ার-ভাটাকে মুখ্য জোয়ার, গৌণ জোয়ার, ভরা কটাল ও মরা কটাল মূলত এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
কেন্দ্রাভিমুখী শক্তিকেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হতে পারে। পৃথিবী তার অক্ষ বা মেরুদণ্ডের ওপর চারদিকে দ্রুত বেগে ঘোরে। এ ঘূর্ণায়মান গতির ফলে ভূপৃষ্ঠ হতে তরল পানিরাশি চতুর্দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবণতা লাভ করে। একেই কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি বলে। চাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার বিপরীত দিকে কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়।
মুখ্য জোয়ারপৃথিবীর আবর্তনকালে যে অংশ চাঁদের সামনে আসে সেখানে চাঁদের আকর্ষণ বেশি থাকে। স্থলভাগ অপেক্ষা পানিরাশির উপর এ আকর্ষণ শক্তির কার্যকারিতা অনেক বেশি বলে চারদিক থেকে পানিরাশি ঐ আকর্ষণস্থলের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে চাঁদের নিকটবর্তী অংশের পানিরাশি ফুলে উঠে মুখ্য জোয়ারের সৃষ্টি করে।
গৌণ জোয়ারচাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার বিপরীত দিকে কেন্দ্রাতিগ বা কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়। চাঁদের আকর্ষণে যেদিকে জোয়ার হয় তার নিচের স্থলভাগকেও চাঁদ আকর্ষণ করে। ফলে জোয়ার সংঘটনের স্থানের বিপরীত দিকে পানিরাশির তুলনায় স্থলভাগ চাঁদের দিকে অধিক আকর্ষিত হয়। ফলে ঐ স্থানে পানিরাশির উপর পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তির প্রভাব কমে যায়। একইসাথে কেন্দ্রাতিগ শক্তির প্রভাবে পানিরাশি যে স্থানে প্রবাহিত হয়ে জোয়ার সৃষ্টি করে, এ লোয়ারই গৌণ জোয়ার।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...