(Advantages of Bangladesh River Transport)
নদীমাতৃক বাংলাদেশের সর্বত্র পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা নদী ব্যবস্থার (নদী, উপনদী ও শাখানদী) ছড়িয়ে রয়েছে। এসব নদীসমূহ অধিকাংশই (বিশেষত দেশের দক্ষিণে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে) নাব্য। এ কারণে নৌপথই বাংলাদেশের স্বাভাবিক (natural) পরিবহণ ও যাতায়াত ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের নৌ পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা
১. কৃষির উন্নয়ন: সুলভ ও সহজ পরিবহণ ব্যবস্থা ছাড়া কৃষিকার্যে উন্নতি হয় না। কৃষিক্ষেত্রে বীজ, সার, যন্ত্রপাতি, শ্রমিক প্রভৃতি নিয়ে যাওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে সুলভ পরিবহণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সমভূমি অঞ্চলে (যেমন- ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল) জলপথের সুবিধা থাকায় এখানে কৃষির উন্নয়ন সহজ হয়েছে।
২. শিল্পোন্নয়ন: বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে (নারায়ণঞ্জ, চাঁদপুর) দ্রুত নানা প্রকারের শিল্প গড়ে উঠার মূলে রয়েছে নদীপথের অবদান। নদীপথে শিল্পের কাঁচামাল সুলভে সংগ্রহ করা যায় এবং শিল্পজাত দ্রব্যও অল্প খরচে দেশের বিভিন্ন বাজারে প্রেরণ করা যায়। তাই দেশের শিল্পোন্নয়নও জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
৩. স্বল্প ব্যয়ে পরিবহণ: অভ্যন্তরীণ জলপথ বাংলাদেশের স্বাভাবিক যাতায়াত ও পরিবহণ ব্যবস্থা। এ পথে পরিবহণ ও যাতায়াত খরচ খুবই কম। যেমন- ঢাকা থেকে চাঁদপুর জলপথে পরিবহনে খরচ সড়ক পথের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ কম।
৪. ভারী পণ্য পরিবহণের সুবিধা: অন্য যেকোনো পরিবহণের তুলনায় জলপথে ভারী বস্তু এক স্থান হতে অন্য স্থানে অতি সহজে স্থানান্তরিত করা যায়। রেল বা সড়কপথে ভারী বস্তু স্থানান্তরিত করা যেমন অসুবিধাজনক তেমনি ব্যয়বহুল। পক্ষান্তরে, জলপথে ভারী পণ্য সহজ ও সুলভে স্থানান্তরতি করা যায়। এজন্যই রানায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে শিল্পজাতপণ্য (বস্ত্র, তৈরি পোশাক, পাট) রপ্তানির প্রয়োজনে নদীপথে পরিবাহিত হয়।
৫. ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নদীপথের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সুলভে পণ্য পরিবহনের কাজে নদীপথ খুবই উপযোগী; দেশের অন্যান্য পথে পণ্যদ্রব্য এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রেরণ করা খুবই কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। ফলশ্রুতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে (সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ) ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নতি লাভকরেছে।
৬. বিশ্ববাণিজ্যে জলপথ: বাংলাদেশের বিশ্ববাণিজ্য চলে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে। এ বন্দর দুটি আবার অভ্যন্তরীণ নদীপথের (চট্টগ্রাম, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা নদী বন্দর) মাধ্যমে সারাদেশের সাথে যুক্ত।
৭. বন্যার তীব্রতা হ্রাস: বন্যাপ্রবণ এ দেশে রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণ করলে অনেক ক্ষেত্রে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। যেমন- নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, সোনারগাঁয়ে ব্যপকভাবে সড়কপথ নির্মাণের ফলে মেঘনা ও শীতলক্ষার অনেক শাখানদী আজ মৃতপ্রায়। এক্ষেত্রে তীব্র বন্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশে জলপথের সংখ্যা বেশি থাকলে অতিসত্বর পানি সরে যেতে পারে। এর ফলে বন্যার তীব্রতা হ্রাস পায়।
উপরিউক্ত আলোচনা হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জলপথের বা নৌ পথের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশে নৌপরিবহন ব্যবস্থার অসুবিধ
বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদী ও খাল-বিল থাকা সত্ত্বেও এদেশ জল পরিবহণ ব্যবস্থা আশানারূপ উন্নতি লাভ করতে পারেনি। এদেশে নৌ পরিবহণ ব্যবস্থায় নানাবিধ সমস্যা বা অসুবিধা রয়েছে। যেমন-
১. নদী ভরাট: প্রতি বছর পলিমাটি জমে বাংলাদেশের নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে এসব নদীতে চরের সৃষ্টি হয় এবং নৌযান চলাচলের অসুবিধা হয়। যেমন- পদ্মা নদী।
২. জলযানের অভাব এদেশে প্রয়োজনের তুলনায় নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার প্রভৃতির সংখ্যা কম। ফলে অভ্যন্তরীণ জলপথে যাতায়াত ও পরিবহণ কার্য ব্যাহত হয়। প্রায় ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীগণকে নদীপথে যাতায়াত করতে হয়।
৩. জলযান প্রস্তুত ও মেরামতের কারখানার অভাব: বাংলাদেশে জলযান প্রস্তুত ও মেরামতের কারখানা খুবই কম। এটা নৌপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির পথে অন্তরায়ের সৃষ্টি করেছে।
৪. যন্ত্রাংশের অভাব: জলযানসমূহে ব্যবহৃত যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না বলে বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। অনেক সময় এসব দ্রব্যের অভাবহেতু বহু নৌযান দীর্ঘ সময় অচল অবস্থায় পড়ে থাকে।
৫. যাত্রীদের সুযোগ সুবিধার অভাব: নদীপথে যাত্রীদের বিশ্রামাগার ও পণ্য গুদামজাতকরণের সুযোগ সুবিধার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে রৌদ্র ও বৃষ্টিতে যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না এবং মালামালেরও ক্ষতি হয়।
৬. ধীরগতিসম্পন্ন জলযান: সাধারণত জলযানের গতি বেশ ধীরে থাকে, তদুপরি বাংলাদেশের জলযানগুলো (আধুনিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনের অভাবে) আরও বেশি ধীরগতিসম্পন্ন। এর ফলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে অধিক সময় ব্যয় হয়।
৭. নিরাপত্তার অভাব: জল্যানগুলো যখন রাতের বেলায় চলাচল করে বা কোনো বন্দরে ভিড়ে তখন নিরাপত্তার অভাব দেখা যায়। নৌরুটে তাই চুরি, ডাকাতি ও দুর্ঘটনা প্রায়ই হয়ে থাকে এবং যাত্রীরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে।
৮. দক্ষ চালকের অভাব: বাংলাদেশে প্রায়ই লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। দক্ষ চালক ও নাবিকের অভাবই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
৯. বেতার যোগাযোগের অভাব: নৌ পরিবহণের নিরাপত্তার জন্য ছোটবড় সব নৌযানেই বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের নদীপথে সর্বত্র বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
১০. সংকেত ব্যবস্থার অভাব: বাংলাদেশের নদীপথে প্রয়োজনীয় সংকেত ব্যবস্থা নেই। এর ফলে রাতের বেলায় লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করতে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়।
১১. মূলধনের অভাব: জলযান নির্মাণের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। মূলধনের অভাবহেতু বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় জলযান নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তাই এ দেশে জলযানের যথেষ্ট অভাব রয়েছে
নৌ পরিবহন উন্নয়নে কতিপয় সুপারিশ: শুকনো মৌসুমে চ্যানেল ঠিক রাখার জন্য যথাযথভাবে ড্রেজিং করা উচিত। ড্রেজিং করে অনেক সময় বালু এমনভাবে রাখা হয় যা আবার নদীবক্ষেই আসে। আবার একই গভীরতায় ড্রেজিং না করাও একটা বড় ত্রুটি। নৌপথে নিরাপত্তা, দক্ষ চালক ও সংকেত ব্যবস্থা উন্নয়নে জরুরী পদক্ষেপ দরকার। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই বন্ধ করার জন্যও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ জরুরী।
পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more